শুধু দণ্ড কার্যকর নয়, সত্য উদ্ঘাটনও জরুরি
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তৎকালীন জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড শুধু একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যাই ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, সামরিক শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এক গভীর আঘাত। স্বাধীনতার পর সামরিক অভ্যুত্থান, পালটা অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতার যে ধারাবাহিকতা বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল আলোচিত ওই অধ্যায়গুলোর অন্যতম।
সম্প্রতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোজাফফরের গ্রেফতারের খবর জাতিকে আবারও সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আত্মগোপনে থাকার পর দণ্ডপ্রাপ্ত ওই আসামিকে আইনের আওতায় আনা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে এ গ্রেফতারের গুরুত্ব শুধু একজন পলাতক আসামিকে আটক করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার বিচার বহু বছর ধরে চলেছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ, তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আদালত কয়েকজন অভিযুক্তকে দণ্ডিত করেছেন। কিন্তু রায় ঘোষণার পরও সব আসামিকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। কেউ কেউ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মুখোমুখি হয়েছেন, আবার কেউ বছরের পর বছর দেশের বাইরে বা আত্মগোপনে থেকে বিচার এড়িয়ে গেছেন। তেমনি আত্মগোপনে থাকা অভিযুক্তদের একজন মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন, যিনি গত ৪৫ বছর ধরে দেশের বাইরে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৬ জুলাই ২০২৬ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীস্থ বনানীর একটি বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি দল তাকে আটক করে। প্রশ্ন হলো একটি রাষ্ট্রে এক দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি এত দীর্ঘ সময় আইনের নাগালের বাইরে কীভাবে থাকতে পারেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা-দুই দিকই সামনে আসে। অতীতে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঘাটতি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পলাতকদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে বাধা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বায়োমেট্রিক তথ্য, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বহু বছরের পলাতক আসামিকেও খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে। সাম্প্রতিক এই গ্রেফতার সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।
মেজর (অব.) মোজাফফরের গ্রেফতারকে শুধু একটি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে আইনের আওতায় আনার ঘটনা হিসাবে দেখলে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অপূর্ণ থেকে যাবে। একজন ব্যক্তি যদি টানা প্রায় ৪৫ বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে দেশে-বিদেশে অবস্থান করতে সক্ষম হন, তবে এটি শুধু তার ব্যক্তিগত কৌশলের বিষয় নয়; বরং এর পেছনে কোনো ব্যক্তি, নেটওয়ার্ক বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ছিল কিনা, তা খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র বা রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দীর্ঘ আত্মগোপনের সময়কাল শুধু বিচার এড়িয়ে যাওয়ার ইতিহাস নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও একটি প্রশ্ন। এক্ষেত্রে শুধু দণ্ড কার্যকর নয়, সত্য উদ্ঘাটনের জন্য তদন্তকারী সংস্থার উচিত জরুরিভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো পরিষ্কার করা-
ক। ১৯৮১ সালের পর তিনি কোন কোন দেশে অবস্থান করেছেন?
খ। কীভাবে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করেছেন এবং ভ্রমণের জন্য কোন পরিচয় বা নথি ব্যবহার করেছেন?
গ। বাংলাদেশে তার কোনো সহযোগী, আশ্রয়দাতা বা অর্থনৈতিক সহায়তাকারী ছিল কিনা?
ঘ। বিদেশে অবস্থানকালে তিনি কোনো রাজনৈতিক, সামরিক বা গোয়েন্দা যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন কি না?
ঙ। তার অবস্থান গোপন রাখতে দেশি বা বিদেশি কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করেছে কিনা?
চ। তিনি আত্মগোপনের সময় বাংলাদেশে একাধিকবার প্রবেশ করে থাকলে, তা কীভাবে সম্ভব হয়েছে এবং এতে কোনো প্রশাসনিক বা নিরাপত্তাজনিত ব্যর্থতা ছিল কিনা?
এ অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কাউকে প্রমাণ ছাড়া অভিযুক্ত করা নয়। বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা। যদি তদন্তে নতুন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠনের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে, তবে তাদের বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার যদি এমন কোনো প্রমাণ না পাওয়া যায়, সেটিও জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা উচিত।