জুলাই কি ব্যর্থ হয়েছে
জুলাই এলে লাভ-ক্ষতির হিসাব হবে। এটা স্বাভাবিক। তবে আমার কাছে জুলাইয়ের অর্জন অনেক বেশি। এর সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে শেখ হাসিনার দুঃশাসনের অবসান।
শেখ হাসিনার আমলে নিয়মিত ‘মায়ের ডাক’-এর অনুষ্ঠানে যেতাম। গুম হয়ে যাওয়া সন্তানের এক পিতা একদিন সেখানে বললেন, ছেলেকে মেরে ফেলা হলে বিচারের দরকার নেই, তার লাশটাও দরকার নেই। শুধু কবরটা জানা দরকার দুহাত তুলে মোনাজাত করার জন্য! শিশুরা আসত পিতার ছবি নিয়ে, মায়েরা সন্তানের ছবি নিয়ে; কেঁদে কেঁদে স্মরণ করত তাদের। এদের মধ্যে এমন শিশুও ছিল, যার জন্মই হয়েছে বাবা গুম হওয়ার পরে।
মায়ের ডাকের এসব অনুষ্ঠানে বুক মোচড় দিয়ে উঠত আমাদের। ভাবতাম, কতটা পাষণ্ড হলে নিজের দেশের মানুষকে এভাবে গুম করা যায়! দুঃখ আর ক্ষোভে আমরা বিদীর্ণ হতাম আরও নানা কারণে। ব্যাংক থেকে সাধারণ মানুষের টাকা লুট, প্রকল্পে সীমাহীন দুর্নীতি, নির্বাচনের নামে প্রহসন, মানুষের দুর্ভোগের প্রতি শেখ হাসিনার নির্মম ঠাট্টা-তামাশা, গায়েবি মামলা, নির্বিচার হামলা, পিলখানা ও শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বৈষম্য ও ডিহিউম্যানাইজেশন, ভারতের প্রতি নতজানু আচরণ—এমন বহু কিছু আমাদের অসহায় যন্ত্রণায় নিমজ্জিত করে রাখত।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল এসব অনাচারের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের দাবানল। কিন্তু জুলাই কি এসবের অবসান ঘটাতে পেরেছে? আমার মতে, অবশ্যই তা পেরেছে, অন্তত বহুলাংশে। গুম কি আর হয়েছে বাংলাদেশে? মানুষ কি ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে? ব্যাংক আর প্রকল্পের লুটতরাজ কি এখন হচ্ছে? বাক্স্বাধীনতা কি ফিরে পেয়েছি আমরা? ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে আত্মমর্যাদাবোধ কি এসেছে আমাদের? আর কোনো শাসক কি বাংলাদেশের মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এই বার্তা দেয় যে প্রায় সব মানদণ্ডেই আমরা শেখ হাসিনা আমলের দুঃশাসনের অবসান পেয়েছি।
অনেকে হয়তো বলবেন, এগুলো শাসনের আলামতের পরিবর্তন; রাষ্ট্র শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, সে কারণে টেকসইও নয়। হতে পারে। কিন্তু জুলুম, শোষণ ও বৈষম্যের অবসান তাতে মূল্যহীন হয়ে যায় না। বরং এগুলোই মানুষের সংগ্রামকে আরও এগিয়ে দেয়, যাতে এসবের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করা যায়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনায় আমরা অনেকে এসব ইতিবাচক দিক এড়িয়ে যাই। কেউ কেউ এটাও বলে বসেন যে জুলাই ব্যর্থ হয়েছে। পলাতক ফ্যাসিবাদী শাসকের অনুসারীরা এটা বলেন, বলেন একচোখা কিছু মানুষও। তাঁদের মতো করে ভাবলে বলা তো যায় ভাষা আন্দোলন, এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধও ব্যর্থ হয়েছে এ দেশে। আমরা রাষ্ট্রভাষা পেয়েছি, কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন কি করতে পেরেছি? আমরা নিজেদের রাষ্ট্র পেয়েছি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য—সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা কি আদৌ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? অল্প ও আশু অর্জনের কারণে আমরা কি তাহলে ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধকে ব্যর্থ বলি? তাহলে জুলাইকে ব্যর্থ কেন বলব?
২
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী এই সরকার প্রথম থেকেই তিনটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল—বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন।
জুলাইয়ে সংঘটিত নির্বিচার গণহত্যার বিচারের লক্ষ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের ট্রাইব্যুনালকে সচল করা হয়েছে, বহু বিচার শুরু হয়েছে, জুলাই গণহত্যার প্রধান আসামি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি বিচার সম্পন্নও হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বাইরে প্রচলিত ফৌজদারি আদালতেও বহু মামলা হয়েছে। এসব মামলা শেখ হাসিনার আমলের মতো গায়েবি মামলা (যে মামলায় কথিত ঘটনাটিই ঘটেনি) নয়, কোনো মামলা সরকারের উদ্যোগে দায়ের করা হয়নি।
তবে কিছু মামলায় এমন বহু মানুষকে আসামি করা হয়েছে, যাদের সঙ্গে অপরাধটির সম্পর্ক থাকার কথা নয়। আমরা এসব মামলা থেকে আপাতদৃষ্টিতে নিরপরাধ ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করেছি। প্রত্যাশিত সুফল আমরা অল্প সময়ে পাইনি, কিন্তু এর পথ দেখিয়ে গেছি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান