গবেষণায় অর্থায়ন: স্বচ্ছতা চাই, আমলাতন্ত্র নয়

বিডি নিউজ ২৪ অধ্যাপক ড. খালিদুর রহমান প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:২০

দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা অর্থায়নের নতুন কাঠামো নিয়ে যে বিতর্কের সূচনা হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নয়। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গবেষণার অর্থ কোথায় থাকবে, কে তা পরিচালনা করবে, অথবা কোন প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ দেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, গবেষকের সৃজনশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল।


দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক বাজেটের অংশ হিসেবেই গবেষণা খাতের অর্থ সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হতো। বিভাগ, অনুষদ এবং গবেষণা কমিটির সমন্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রের একাডেমিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে শিক্ষকরা গবেষণা অনুদান পেতেন। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে সেই কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। এখন গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ নিয়ন্ত্রণ করবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা পরিকল্পনা, উপখাতভিত্তিক চাহিদা এবং বাজেট প্রাক্কলন জমা দিতে হবে। এরপর প্রকল্প মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থ ছাড় করা হবে।


সংশ্লিষ্টদের যুক্তি হলো, গবেষণায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণা অনুদানের যথাযথ ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নের মান এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা অর্থায়নের ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক।


কিন্তু এখানেই বিতর্কের সূচনা। বিদ্যমান ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা দূর করতে গিয়ে এমন কোনো কাঠামো তৈরি হচ্ছে কি না, যা গবেষণার স্বাভাবিক গতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে সংকুচিত করবে?


বিশ্বের যেসব দেশ আজ গবেষণা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতির নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান–প্রতিটি দেশেই রাষ্ট্র গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করে। কিন্তু অর্থায়নের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতাও সমান গুরুত্ব পায়।


অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া তার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করে। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৬ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বোচ্চগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, জার্মানি প্রায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং জাপান প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ জিডিপি গবেষণায় বিনিয়োগ করে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় এখনো জিডিপির দশমিক ৩ শতাংশেরও নিচে। অর্থাৎ গবেষণায় অর্থের স্বল্পতা যেখানে বড় বাস্তবতা, সেখানে অর্থ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


তবে উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, গবেষণার মান উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সমন্বয় প্রয়োজন হলেও গবেষণা পরিচালনার দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেই থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথসহ বিভিন্ন সংস্থা প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান দেয়। কিন্তু প্রকল্প পরিচালনা, অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণার প্রশাসনিক দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই পালন করে। যুক্তরাজ্যে গবেষণা কাউন্সিলগুলোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্লক গ্র্যান্ট পায়, যা তারা নিজস্ব গবেষণা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যবহার করতে পারে। জার্মানিতে কেন্দ্রীয় সরকার, অঙ্গরাজ্য এবং স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরেও সরকার গবেষণার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেয়, কিন্তু গবেষণার বাস্তবায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন হয়।


আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার এই ধারাবাহিকতা বিষয়টিকে স্পষ্ট করে। গবেষণা অর্থায়নে জবাবদিহি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, তারা একে অপরের পরিপূরক। জবাবদিহিহীন স্বাধীনতা যেমন অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি স্বাধীনতাহীন জবাবদিহি গবেষণাকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে ফেলে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও