বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কী স্বাধীন? জনপরিসরে এমন প্রশ্ন সচরাচর করা হয়ে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কখনও এই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। এই প্রশ্ন প্রবলভাবে সামনে আসে বিগত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে। একইভাবে, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের অন্যতম জনপ্রিয় পরিভাষা ছিল—‘ঢাকা না দিল্লি; ঢাকা, ঢাকা’। এই পরিভাষাটি তৈরি হওয়ার পেছনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ভারতকেন্দ্রিক’ পররাষ্ট্রনীতিকেই প্রধান অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আওয়ামী লীগের পতনের পর সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে গঠিত ও ক্ষমতায়িত ‘কিংস পার্টি’ এবং সেটির নৈতিক ও প্রক্রিয়াশীল রাজনৈতিক অ্যালাইয়ের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল ‘সিনা টান টান’ (স্ট্যান্ড টল) তত্ত্বের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতিকে ঢেলে সাজানো। এই জনতোষী ‘সিনা টান টান’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে এই নতুন রাজনৈতিক শক্তি যে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার সৃষ্টি করে, সেটির মেয়াদ ছিল তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আগ-পর্যন্ত। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর এই তত্ত্বের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস পালনকে কেন্দ্র করে সেই আলোচনা আবার সামনে এসেছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন ‘অক্ষ’ তৈরি হয়েছে। আর এই নতুন ‘পররাষ্ট্র অক্ষের’ সঙ্গে যুক্ত হতে বাংলাদেশকে অনেক ক্ষেত্রে দেশ ও জাতির স্বার্থকে উপেক্ষা করতে হয়েছে।
এই নতুন অক্ষের আলোচনা আজ নয়; বরং এই লেখার মূল উদ্দেশ্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো কী কী, সেটি বিশ্লেষণ করা। অর্থাৎ, কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীনভাবে নিজের জাতির জন্য কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই সম্ভাবনা বাংলাদেশ কতটা সফলভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে? বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বিবেচনায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হলো—‘দেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান’, ‘ক্রমবর্ধমান বিশাল অর্থনৈতিক বাজার’ ও ‘কাঠামোগত বিনিয়োগ’। অন্যান্য অনেক বিষয়সহ বর্তমানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর মূলত এই তিনটি বিষয় নিয়েই বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। কারণ, সম্প্রতি এই তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয় বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কাছে আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত করেছে; যা একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য পররাষ্ট্রনীতির ‘শক্তি’ ও ‘দুর্বলতা’।
প্রথমত, ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর ও ভারত সাগরের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র অঞ্চলের একটি কৌশলগত প্রবেশপথ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ধরনের কৌশলগত রাষ্ট্র বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, মিয়ানমার ও ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হতে হলে বৈশ্বিক শক্তির জন্য এই অঞ্চলে বাংলাদেশ একমাত্র ‘উপায়’। আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশ হলো এমন একটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিভাজিত রাজনীতির কারণে ক্ষমতা ও অর্থের ‘বুভুক্ষু’ জনগোষ্ঠীকে সহজেই ‘বশ’ করা যায়। দুর্বল রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট বিরাজমান থাকায় সম্প্রতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আগ্রহও নজর কাড়ার মতো। উদাহরণস্বরূপ, গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিযোগিতামূলক পররাষ্ট্রনীতি উল্লেখযোগ্য।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে লক্ষ্য করা যায়, পাকিস্তানের বাংলাদেশমুখী কূটনীতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যে দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়, হঠাৎ সেই বাংলাদেশের সমস্ত কিছুতে তাদের প্রবল আগ্রহ বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আন্তর্জাতিক রিয়ালিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পাকিস্তানের এই হঠাৎ পরিবর্তন আদর্শগত পরিবর্তনের চেয়ে কৌশলগত পুনর্বিন্যাস বা ‘আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য’ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভারতের সঙ্গে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে হারানো কৌশলগত ক্ষতি পোষাতেই তাদের এই অতিব্যস্ততা। এই সময়ে ভারত কিছুটা স্থিতিশীল ও ‘সাবধানে চল’ নীতিতে চললেও, নতুন সরকারের সঙ্গে কথিত সমঝোতা ভারতের আগ্রহকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। সর্বশেষ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী পুনঃআগমন। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা এবং বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা দেশটির ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর, ভারত সাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন অন্যতম আগ্রহের কেন্দ্র।
দ্বিতীয়ত, বিশাল জনগোষ্ঠী ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা থাকায় বড় অর্থনীতির জন্য সহজলভ্য বাজার তৈরির একটি অমিত সম্ভাবনা আছে। এছাড়াও সস্তা শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে লাভজনক ব্যবসা করারও বিরাট সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রেও দেখা যায়, বৈশ্বিক অনেক শক্তি প্রবল আগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা করতে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের অনেক দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে এই ধরনের ব্যবসায় যুক্ত।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক অমিত সম্ভাবনা থাকলেও দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি সংকট রয়েছে। জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেহেতু একধরনের উন্নয়নের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তাই বিনিয়োগকারী দেশের জন্যও এটি একটি বিরাট সম্ভাবনার দেশ। তাই লক্ষ্য করা যায় যে, ধীরে ধীরে বাংলাদেশ কাঠামোগত বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। এই ক্ষেত্রে একসময় ভারত ও চীনের মধ্যে একটি চাপা প্রতিযোগিতা বিরাজমান ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ চীনমুখী হয়ে পড়ে। কাঠামোগত উন্নয়নের বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বর্তমানে এ খাতে চীনের একচ্ছত্র অধিপত্য।