বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা ও আমাদের প্রস্তুতি

কালের কণ্ঠ ড. মো. ফখরুল ইসলাম প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১১:১৩

মধ্য জুন ২০২৬ থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন ঘন সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্প মানুষের মনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা, জাপান, আফগানিস্তান, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, চীনের সিচুয়ান এবং বাংলাদেশের ভূমিকম্প—মানুষের মনে ভয় জাগিয়ে তুলেছে।

আমাদের দেশে যাঁরা বহুতল ইমারতে বসবাস করছেন, পুরনো ঘিঞ্জি এলাকায় নড়বড়ে দালানকোঠায় কোনো রকমে ঠাঁই নিয়ে পরিবার-পরিজনসহ বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁরা বেশ আতঙ্কিত জীবন যাপন করছেন। গেল মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প আসলে আমাদের কী বার্তা দিয়ে ফেলেছে, তা নিয়ে ভূমিকম্পবিশারদদের মধ্যে ভাবনার অন্ত নেই।


ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ। পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলো ক্রমাগত সঞ্চালিত হচ্ছে। যখন দুটি প্লেটের মধ্যে চাপ দীর্ঘদিন ধরে জমা হয় এবং হঠাৎ তা মুক্তি পায়, তখনই ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়ার উপায় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এসব ভূমিকম্প মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তাও।


সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় একাধিক ভূমিকম্প স্থানীয় জনগণের সঙ্গে গোটা দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ২৪ জুন ২০২৬ দেশটিতে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ৩ জুলাই পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে এটিকে দেশটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের দুই হাজার ছয় শর বেশি উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর এবং ভারী যন্ত্রপাতির সহায়তায় ভেনেজুয়েলার উদ্ধার দলগুলো কংক্রিট ও লোহার স্তূপের নিচে চাপা পড়া জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চার দিন পর আবারও ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় ৪.৬ মাত্রার একটি আফটারশক অনুভূত হওয়ায় উদ্ধারকর্মী ও বেঁচে যাওয়া মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। সেখানে সাড়ে চার হাজার মানুষ আহত এবং ৫২ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।


অন্যদিকে জাপান পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। প্রায় প্রতিবছরই দেশটি ছোট-বড় অসংখ্য ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়। তবু জাপানে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম। কারণ তারা ভূমিকম্পকে অস্বীকার করেনি, বরং বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে প্রস্তুতি নিয়েছে। ভূমিকম্প সহনশীল ভবন, উন্নত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া এবং জনগণের সচেতনতা জাপানকে বিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় উদাহরণে পরিণত করেছে।


আফগানিস্তানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক বছরে দেশটিতে সংঘটিত একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প কয়েক হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চল, দুর্বল আবাসনব্যবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমিত উদ্ধার সক্ষমতার কারণে ভূমিকম্প সেখানে মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়। আফগানিস্তানের ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুর্যোগের মাত্রা শুধু ভূমিকম্পের শক্তির ওপর নির্ভর করে না, একটি দেশের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে।


বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। যদিও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের বিধ্বংসী ভূমিকম্প ঘটেনি, তবু মাঝেমধ্যে অনুভূত কম্পন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে বাংলাদেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থান করছে। দেশের দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্ব এই ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।


বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক প্রভাব বিদ্যমান। সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চলের আশপাশে কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শক্তি কোনো এক সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্ম দিতে পারে। ইতিহাসও সে সাক্ষ্য দেয়। ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প এই অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল। ফলে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।


ঢাকা মহানগরীকে কেন্দ্র করে যে ভয় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হলো একটি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি। রাজধানীতে বহু ভবন যথাযথ প্রকৌশল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় সরু রাস্তা, অপর্যাপ্ত খোলা জায়গা এবং অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো তাই বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের আগাম সতর্কসংকেত। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই নগরীতে সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং খোলা জায়গার অভাব বড় ধরনের দুর্যোগে উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। অনেক এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ বা উদ্ধারযান প্রবেশ করাই কঠিন। তাই নগর পরিকল্পনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নির্ধারণ এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও