উগ্রবাদ আছে, ‘জঙ্গি নেই’: আত্মতুষ্টির আড়ালে বাড়ছে কি ঝুঁকি?
ঢাকার কূটনৈতিকপাড়া গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ একসময় দেশি-বিদেশি মানুষের কোলাহলে মুখরিত থাকত। ২০১৬ সালের ১ জুলাই সন্ধ্যার পর দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও নারকীয় জঙ্গি হামলায় রেস্তোরাঁটি মুহূর্তেই এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়।
ভয়াবহ সেই হত্যাযজ্ঞ আর প্রায় ১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস জিম্মি সংকটের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল পুরো জাতি। সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে শেষমেশ সেই জিম্মিদশার অবসান ঘটলেও, ততক্ষণে জঙ্গিদের হাতে ১৭ জন বিদেশিসহ মোট ২২ জন প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তাও ছিলেন। জঙ্গিদের গুলি ও বোমাবর্ষণে আহত হন পুলিশের আরও অনেক সদস্য।
পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো সদস্যদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে এবং নিহত হন হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি। এই ভয়াবহ হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নেপথ্যের লোমহর্ষক সব তথ্য উন্মোচন করে। বিভিন্ন সময়ে এই হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের যোগসাজশের বিষয়টিও সামনে আসে।
আজ সেই ভয়াল গুলশান হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর। এই ঘটনার পর দেশের প্রথাগত চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে একটি নতুন সত্য উন্মোচিত হয়— দেখা যায়, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও জঙ্গি-উগ্রবাদে জড়াচ্ছেন। একই সঙ্গে এই হামলা স্পষ্ট করে দেয় যে, স্থান যতই নিরাপদ বা সুরক্ষিত হোক না কেন, নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি ছাড়া ঝুঁকির আশঙ্কা থেকেই যায়।
বিগত সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও মামলার রায়
হলি আর্টিজান হামলার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের জঙ্গিবাদ-বিরোধী অবস্থান ও কার্যক্রম তীব্র প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। ক্ষুণ্ন হওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে সরকার তখন জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশজুড়ে এক হাজারের বেশি অভিযান পরিচালনা করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযানে হলি আর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও শীর্ষস্থানীয় আট জঙ্গি নিহত হন।
তারা হলো— তামিম আহমেদ চৌধুরী (৩৩), নুরুল ইসলাম মারজান (২৩), সারোয়ার জাহান মানিক (৩৫), তানভীর কাদেরী (৪০), বাশারুজ্জামান চকলেট (৩২), মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম (৩৭), মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান (৩২) এবং রায়হানুল কবির রায়হান ওরফে তারেক (২০)।
ওই চাঞ্চল্যকর ঘটনার জেরে গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। টানা এক বছর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান। আদালত সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে খালাস দেন।