বাজেটে তরুণদের জন্য বরাদ্দ ও তার বাস্তবায়ন
বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। বিশাল এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন নীতি থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পনা, অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বরাবরই ব্যাপক গড়িমসি লক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশের বিশালসংখ্যক তরুণ যদি শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে জনসংখ্যার এই সুবিধা একটি বোঝায় পরিণত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাজেটে তরুণদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ শুধু একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং এটি একটি দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। তরুণদের জন্য বাজেটে যেসব খাতে বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ তা হলো—শিক্ষা ও প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। উদাহরণস্বরূপ, যুগোপযোগী শিক্ষা ও স্কিল ডেভেলপমেন্টে বিনিয়োগ করা মানে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এক দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি।
একইভাবে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ ফান্ড, কর রেয়াত ও মেন্টরিং সাপোর্ট দিলে কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের নতুন দরজা খুলে যায়।
আবার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা ও পরিষেবা তরুণদের আত্মবিশ্বাস ও জীবনের মান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই খাতটি এখনো অবহেলিত, অথচ বিষণ্নতা ও হতাশায় ভোগা তরুণদের হার দিন দিন বাড়ছে। বাজেটে এই খাতেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তরুণদের সম্ভাবনা অনন্ত, যদি রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়ায়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা নির্ধারিত হয় সেই দেশের তরুণদের ওপর। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও স্বপ্ন যেন অগ্রাধিকার পায়, সেটিই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের অন্যতম দায়িত্ব। বাজেটে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র কী এবং কেমন থাকছে— সেটি খুঁজে বেড়াচ্ছে তরুণরা। এ ক্ষেত্রে আশার বাণী হলো, তথ্য-প্রযুক্তি খাতে তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার চায় তরুণরা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির নেতৃত্ব দেবে। প্রস্তাবিত বাজেটে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সরাসরি বরাদ্দ এবং স্টার্টআপ তহবিল মিলিয়ে দেশের পাঁচ কোটি তরুণ বা যুবকের ভাগে মাথাপিছু বরাদ্দ পড়ে প্রায় ৬৫৭ টাকা। তবে শিক্ষা, কারিগরি ও আইটি খাতের মতো যুব সম্পৃক্ত পরোক্ষ খাতগুলোর হিসাব যুক্ত করলে এই মাথাপিছু বরাদ্দের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৮ হাজার টাকা। পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও যুব উন্নয়ন মিলিয়ে মোট এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। (কালের কণ্ঠ, ১৩ জুন ২০২৬)
বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওপর কর অব্যাহতি আছে। এতে ফ্রিল্যান্সাররা তাঁদের আয় বৈধ পথে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনতে উৎসাহিত হবেন। এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সারের সেবার ওপর আরোপ করা ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধাও পাবেন বলে বাজেটে বলা হয়। এমনকি প্রযুক্তি খাতে প্রতিবছর দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ ছাড়া কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে ফ্রিল্যান্সিং ও ক্রিয়েটিভ খাতে ব্যাপক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরো আট লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবিকা নির্ভর করে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), তৈরি পোশাক শিল্প এবং অনানুষ্ঠানিক সেবা খাতের ওপর। তৈরি পোশাক খাত এখনো দেশের প্রধান রপ্তানি খাত হলেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, বাজার সংকোচন এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাচ্ছে। ফলে তরুণ, নারী, শিক্ষিত বেকার, ক্ষুদ্র কৃষক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। এ কারণে বলা যায়, কর্মসংস্থানমুখী খাতগুলোকে শক্তিশালী না করে শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করলেও তার সুফল সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে পৌঁছবে না। বিগত ইউনূস সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে দেশে অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তরুণদের একটি বড় অংশ বেকার হয়েছে। এমনকি ওই সময়ে নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। ওই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের অসতর্ক বক্তব্য ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হয়েছে। অসংখ্য গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সৃষ্ট পরিবেশ স্বাভাবিক করতে সরকারকে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- তরুণ প্রজন্ম
- বাজেট বরাদ্দ