ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ: জায়নবাদ, হিন্দুত্ববাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের তুলনামূলক পাঠ
উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপজুড়ে ইহুদি-বিদ্বেষের (পশ্চিমা পরিভাষায় অ্যান্টিসেমিটিজম) ঢেউ যখন তীব্র হচ্ছিল, তখন একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন ইহুদি বুদ্ধিজীবী মহলে জরুরি হয়ে উঠল: ইউরোপের ইহুদিরা কি কোনো দিন নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে রাজনৈতিক মতবাদের জন্ম হয়, তার নাম জায়নবাদ। শব্দটি এসেছে জেরুজালেমের একটি পাহাড়ের নাম 'জায়ন' থেকে, যা ইহুদি ধর্মীয় কল্পনায় প্রতিশ্রুত ভূমির প্রতীক। জায়নবাদ মূলত এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে বিশ্বের ইহুদিরা একটি জাতি এবং এই জাতির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রয়োজন।
জায়নবাদের উৎস ও মূল তাত্ত্বিকরা
জায়নবাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠাতা হলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাংবাদিক থিওডোর হার্টজল (১৮৬০-১৯০৪)। ১৮৯৪ সালে ফ্রান্সে আলফ্রেড ড্রেফাস মামলা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করার পর তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ইউরোপীয় সমাজে ইহুদি-বিদ্বেষ একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা সংস্কারের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। ১৮৯৬ সালে তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Der Judenstaat’ (ইহুদি রাষ্ট্র) প্রকাশ করেন, যেখানে যুক্তি দেন যে ইহুদিরা ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, একটি জাতি এবং এই জাতির জন্য নিজস্ব সার্বভৌম রাষ্ট্র অপরিহার্য। ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে তিনি প্রথম জায়নিস্ট কংগ্রেস আহ্বান করেন, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষিত হয়।
হার্টজলের আগেই অবশ্য লেও পিনস্কার (১৮২১-১৮৯১) তার ‘Auto-Emancipation’ (১৮৮২) গ্রন্থে যুক্তি দেন যে ইহুদিরা ইউরোপে সবসময়ই 'অন্য' বা অপর (the other) হিসেবে বিবেচিত হবে, তাই তাদের নিজস্ব মাটিতে নিজেদের মুক্তি অর্জন করতে হবে। অপরদিকে আশের গিনজবার্গ, যিনি 'আহাদ হা-আম' নামে পরিচিত (১৮৫৬-১৯২৭), হার্টজলের রাজনৈতিক জায়নবাদের বিপরীতে 'সাংস্কৃতিক জায়নবাদ'-এর ধারণা তুলে ধরেন। তার মতে, একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ইহুদি সংস্কৃতি, ভাষা ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। ফিলিস্তিন হবে ইহুদি সভ্যতার আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, সব ইহুদির বাসস্থান নয়।
সমাজতান্ত্রিক জায়নবাদের প্রতিনিধি নাহমান সিরকিন (১৮৬৭-১৯২৪) এবং বের কাটজনেলসন (১৮৮৭-১৯৪৪) জায়নবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাদের কাছে ইহুদি রাষ্ট্র হবে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজের পরীক্ষাক্ষেত্র। অন্যদিকে ভ্লাদিমির জাবোটিনস্কি (১৮৮০-১৯৪০) 'রিভিশনিস্ট জায়নবাদ' প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তির প্রয়োগকে ন্যায়সংগত বলে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। আধুনিক ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিতে জাবোটিনস্কির প্রভাব এখনও সুস্পষ্ট।
জায়নবাদের মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো 'ইহুদি জাতিসত্তার' ধারণা, অর্থাৎ বিশ্বের যেখানেই ইহুদিরা বসবাস করুক না কেন, তারা একটি একক জাতি। এ ধারণা ঐতিহ্যগত ধর্মীয় পরিচয়কে একটি আধুনিক জাতীয়তাবাদী কাঠামোতে রূপান্তরিত করে। উনিশ শতকের ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ঢেউয়ে যখন বিভিন্ন জাতি নিজস্ব রাষ্ট্র দাবি করছিল, ইহুদি চিন্তাবিদরাও সেই একই যুক্তিকাঠামো ব্যবহার করে ‘ইহুদি জাতির’ জন্য রাষ্ট্র দাবি করতে শুরু করেন।
জায়নবাদের সমালোচনা: বিভিন্ন ধারা
জায়নবাদের সমালোচনা বহু দিক থেকে এসেছে এবং এই সমালোচনাগুলো পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ফিলিস্তিনি ও আরব সমালোচনা সবচেয়ে প্রত্যক্ষ এবং ভৌগোলিকভাবে সংশ্লিষ্ট। ফিলিস্তিনি-আমেরিকান চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাইদ (১৯৩৫–২০০৩) তার ‘The Question of Palestine’ গ্রন্থে যুক্তি দেন যে জায়নবাদ মূলত একটি ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী প্রকল্প, যা আরেকটি জাতির ঐতিহাসিক ভূমিতে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তার বিখ্যাত 'Orientalism' তত্ত্বের আলোকে তিনি দেখান কীভাবে পশ্চিমা ডিসকোর্সে ফিলিস্তিনিদের অনুপস্থিত, অপ্রাসঙ্গিক বা প্রান্তিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্যান-আরব জাতীয়তাবাদীরা ঐতিহাসিকভাবে যুক্তি দিয়েছেন যে ১৯৪৮ সালের 'নাকবা' (মহাবিপর্যয়)—যেখানে সাত লক্ষেরও বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন—জায়নবাদের অনিবার্য পরিণতি।