উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন ‘ম্যাজিক কার্ড’
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত হলো দেশের অর্থনীতির ‘প্রাণশক্তি’, যা সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান, উৎপাদন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখে। এদের ওপর ভর করে গড়ে উঠে টেকসই ভারী শিল্প-কারখানা। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে এ শ্রেণির ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে একটি দুষ্টু একচেটিয়া ব্যবসায়ী চক্র, যাদের বলা হয় ‘অলিগার্ক’-যারা প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে স্মার্ট ব্যবসায়ী সম্মেলন করে শেখ হাসিনাকে আজীবন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বহাল রাখতে চেয়েছিল। এক নির্লজ্জ দাম্ভিকতা দেখিয়েছিল এ দুর্নীতিবাজ চক্র।
কার্ড রাজনীতি : ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শেখ হাসিনা বিদেশ থেকে ধারদেনা করে অর্থ এনে এবং দেশের মানুষের ওপর অমানবিকভাবে কর বাড়িয়ে নিম্নআয়ের ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন কার্ড বিতরণ করে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চেয়েছিলেন, যাতে তারা কখনো তার ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে ইচ্ছা পোষণ না করে। অপরদিকে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে শক্তিশালী না করার কারণে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়নি; ফলে বেড়ে গেছে বেকারত্ব, সমাজে সৃষ্টি হয়েছে চরম অস্থিরতার।
ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা : এখন ভদ্রভাবে মানসম্মান নিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানা পরিচালনা করার সুযোগ বাংলাদেশে আছে কিনা, তা দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) উদ্যোগে আয়োজিত এক সম্মেলনের মাধ্যমে আশার আলো দেখাতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে তার আশা পূরণ হয়েছিল কিনা, তা জানা গেল না। প্রশ্ন হলো, নাগরিকরা নিজের দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী কিনা? বিনিয়োগ করলে লাভ তো দূরের কথা, একজন উদ্যোক্তা মূলধন এবং মানসম্মান নিয়ে ফিরতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে। সবাই বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে-বড় জনসংখ্যা, সস্তা শ্রম, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, বড় ভোক্তা বাজার, রপ্তানির সুযোগ; কিন্তু তারপরও ‘বিনিয়োগবান্ধব’ হিসাবে দেশটি ইদানীং প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। কী কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে অনীহা প্রকাশ করে নিজেদের সব পুঁজি আদম বেপারিদের হাতে তুলে দিয়ে বিদেশে চাকরি করার জন্য স্বপ্ন দেখে? নিজের দেশে সফল উদ্যোক্তা হিসাবে যার আত্মপ্রকাশ করার সম্ভাবনা ছিল, তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে ভেবেছিলেন; কিন্তু তিনি বাধ্য হয়ে ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য নিজেই চলে যান বিদেশে কর্মচারী বা শ্রমিক হয়ে।
কেন এমন হচ্ছে : ফ্যাসিস্টের আমলে আইনের শাসনের মাধ্যমে সুবিচার পাওয়া যায়নি, ছিল ব্যবসায়িক বিরোধের নিষ্পত্তির অনিশ্চয়তা, চুক্তি বাস্তবায়ন, জমি বিরোধ, ব্যাংক ঋণের জটিলতা-এসব নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। এ ছাড়া রয়েছে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা, লাইসেন্স অনুমোদন, ট্যাক্স, পুলিশের ঝামেলা, কাস্টমস ইত্যাদি। কাগজে-কলমে বিভিন্ন সেবা চালু করার কথা বলা হলেও বাস্তবে ঘটে তার উলটোটা। সেবার পরিবর্তে করা হয় হেনস্তা। ব্যবসায়ী নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, হঠাৎ করে নিয়মকানুন পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কেউ করতে পারে না। সবকিছু চলছে এডহক ভিত্তিতে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ব্যাংক ঋণের জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল শাসন-এসব কারণে আর্থিক খাতের ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ চান। দেশে রয়েছে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। কম মজুরির শ্রমশক্তি থাকলেও দক্ষতা, সততার অভাব প্রকট। এসব অসৎ লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে রাজনৈতিক এবং সামাজিক চাপ আসে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি আগে কেউ কখনো দেখেননি।
অলিগার্কদের লালন-পালন : যেসব অলিগার্ক (দুষ্টু ব্যবসায়ী চক্র) ফ্যাসিস্ট শাসনামলে অবৈধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ছোট মাঝারি ব্যবসায়ীদের নিঃশেষ করে ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে, তারা এখনো বহাল তবিয়তে থেকে দেশকে আবারও ধংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে এনে ব্যবসা বাণিজ্যের বৈষম্য দূর করার দাবি ইতোমধ্যেই উঠেছে; কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ফ্যাসিস্টসৃষ্ট ওইসব দালাল ব্যবসায়ী বর্তমান সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে হাসিমুখে বৈঠক করছে। তারা দেখিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশে যে সরকারই আসুক না কেন, তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে; কারণ তাদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে বাংলাদেশের ব্যাংক, বীমা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এসব দুষ্টু ব্যবসায়ীর হাতে কল-কারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য জিম্মি না হলে এতদিনে হাজার হাজার ছোট এবং মাঝারি উদ্যোক্তারা বড় উদ্যোক্তা হিসাবে আবির্ভূত হতো। তারা বিদেশে অর্থ পাচার না করে বরং দেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করতেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আওয়ামী লীগ বরাবরই বাগাড়ম্বর করে এসেছে। আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী ছিল, তা আওয়ামী লীগ কখনো সুস্পষ্ট করতে পারেনি। বৈষম্য দূরীকরণ ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা কর্মসূচি প্রদান করেন, যা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশের মানুষ অর্থনৈতিক মুক্তি পাবে, স্বাধীনভাবে ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে পারবে এবং স্বাবলম্বী হবে-এগুলো ছিল প্রধান আকাক্সক্ষা। গরিব শ্রেণি নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে, মধ্যবিত্ত উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে এবং উচ্চমধ্যবিত্ত ধনিক শ্রেণিতে রূপান্তরিত হতে চেয়েছিলেন। ওপরে উঠার স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলেন এ দেশের জনগণ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- উদ্যোক্তা
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প