সুকুকের সাফল্যের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো
একসময় সরকারি অর্থায়নের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল সঞ্চয়পত্র। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিধবা নারী, ক্ষুদ্র সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবার নিরাপত্তা এবং নিশ্চিত মুনাফার আশায় এখানে সঞ্চয় রাখতেন। সরকারও দীর্ঘদিন এই খাত থেকেই বাজেট ঘাটতির একটি বড় অংশের অর্থ সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র ছিল সরকার এবং সাধারণ মানুষের পারস্পরিক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ।
কিন্তু সেই আস্থায় এখন স্পষ্ট ভাটা পড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে টানা চার বছর সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল ঋণাত্মক ৩ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকায়। ২০২৪-২৫ সালে তা কমে ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকায় এলেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চেই নিট বিক্রি আবার ঋণাত্মক ২ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ বছরও পুরো অর্থবছর ঋণাত্মক থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এর সহজ অর্থ, নতুন বিনিয়োগের চেয়ে পরিপক্ব সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে সরকারকে বেশি টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে।
সঞ্চয়পত্রের এই ধারাবাহিক পতন শুধু একটি আর্থিক পণ্যের জনপ্রিয়তা কমার গল্প নয়, এটি মানুষের কমে যাওয়া সঞ্চয়ক্ষমতারও প্রতিফলন। গত দুই বছরে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে অনেক পরিবারের আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে খাদ্যের পেছনে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। অনেক তরুণ এখনো স্থায়ী চাকরি পাননি, আবার অনেকে নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা হারিয়েছেন। ফলে সংসারের খরচ মিটিয়ে নতুন করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করার সুযোগ খুব কম মানুষের থাকে; বরং প্রয়োজনের তাগিদে অনেকে মেয়াদপূর্তির আগেই পুরোনো সঞ্চয়পত্র ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে সরকারের জন্যও আগের মতো এই খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থ সংগ্রহ কমে যাওয়ায় সরকার স্বাভাবিকভাবে ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাতের অংশ ৮৫ শতাংশের বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন অর্থবছরে এই নির্ভরতা গড়ে ৮৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আমার মতে, এই প্রবণতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ক্রাউডিং আউট। সরকার যত বেশি ব্যাংকঋণ নেবে, উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুযোগ তত কমবে। এতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংকের তারল্য কমে যাবে, অনেক উদ্যোক্তা উচ্চ সুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণবাজারের দিকে ঝুঁকবেন, আর সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও মন্থর হয়ে পড়বে। শুধু নতুন আর্থিক পণ্য চালু করে এই সংকটের সমাধান হবে না, যদি মানুষের সঞ্চয়শক্তি ক্ষয়ের মূল কারণ, অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয়ের অস্থিরতা নিয়ে কাজ করা না হয়।
এই বাস্তবতায় সামনে এসেছে সুকুক। এটি শরিয়াহভিত্তিক একটি আর্থিক উপকরণ, যেখানে সুদের পরিবর্তে প্রকল্প বা সম্পদের প্রকৃত আয় থেকে মুনাফা দেওয়া হয়। সুদভিত্তিক বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি বড় তহবিল এত দিন কার্যত অব্যবহৃত ছিল। সেই শূন্যতা পূরণে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রথম সার্বভৌম সুকুক চালু করে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৯টি সুকুকের মাধ্যমে মোট ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রথম ৯ মাস মেয়াদি স্বল্প মেয়াদি সুকুক চালুর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
সুকুকের প্রতি বাজারের আগ্রহও স্পষ্ট। অষ্টম সুকুকে ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকার বিপরীতে বিড জমা পড়েছিল ৭২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা, আর নবম সুকুকে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিপরীতে ৪৭ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এই বিপুল চাহিদার মূল কারণ, দেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের প্রায় ২৭ শতাংশই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের হাতে, যাদের এত দিন সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ ছিল না। সুকুক সেই সুযোগ তৈরি করায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, ইসলামিক উইন্ডো, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয়ভাবে এতে বিনিয়োগ করছে।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান এই পথে অনেক আগে এগিয়ে গেছে, মালয়েশিয়ার সুকুক বাজার তো এখন বিশ্বের বৃহত্তম। বাংলাদেশও সেই পথ ধরে এগোচ্ছে এবং সরকার এখন আরও একধাপ এগিয়ে শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালুর কথা ভাবছে, যার মুনাফার হার নির্ধারণ করবে একটি কারিগরি কমিটি। এটা বাস্তবায়িত হলে ইসলামি অর্থায়ন প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাবে, যা একসময় সঞ্চয়পত্রের মূল শক্তি ছিল।