বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়লেও বাংলাদেশ পিছিয়ে
যেকোনো দেশের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ সবচেয়ে আকর্ষণীয় সুযোগ। সব দেশই বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে।
এই উদ্দেশ্যে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা হয় এবং কিছু প্রণোদনাও দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি চলে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা। বিশ্বে এই যে এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিবাদ, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং প্রতিযোগিতা, এর মূলে আছে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য, যার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বিনিয়োগ। সব কিছুর মূলে আছে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে কি না, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে কি না এবং এই উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে কি না।
যখন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় তখন ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসে, যার সার্বিক প্রতিফলন ঘটে অর্থনৈতিক উন্নতিতে। এর ঠিক বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি হয়, যখন দেশে বিনিয়োগ থাকে না। বিনিয়োগ সাধারণত দুভাবে হয়ে থাকে, যথা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ। বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা আছে যে অন্য দেশ থেকে যখন পুঁজি নিজের দেশে আসে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত হয়, তখনই আমরা তাকে বৈদেশিক বিনিয়োগ বলে অভিহিত করে থাকি।
কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বৈদেশিক বিনিয়োগের ধারণা বদলে গেছে। এখন ক্রসবর্ডার ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বা এক দেশ থেকে আরেক দেশ অথবা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যখন ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন বা বাজারজাতকরণ সম্প্রসারণ করা এবং সেই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে ও অঞ্চলে অর্থ, দক্ষতা ও প্রযুক্তি নিয়োজিত করা হয়, তখন তা বৈদেশিক বিনিয়োগের পর্যায় পড়ে। এ কারণেই এখন বৈদেশিক বিনিয়োগকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বা ক্রসবর্ডার বিনিয়োগও বলা হয়ে থাকে।
বৈদেশিক বিনিয়োগ যেমন অন্য দেশ থেকে নিজের দেশে আসতে পারে, তেমনি নিজ দেশ থেকে অন্য দেশে যেতেও পারে। যেমন—বিদেশ থেকে অনেক বিনিয়োগ যেমন বাংলাদেশে আসতে পারে, তেমনি বাংলাদেশ থেকে কিছু বিনিয়োগ বিদেশেও যেতে পারে।
আমেরিকার কোনো বিনিয়োগকারী যখন বাংলাদেশে ব্যবসা বা উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিদেশ থেকে অর্থ এনে এখানে বিনিয়োগ করবে, তখন সেটি হবে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ, অর্থাৎ অন্তর্মুখী বৈদেশিক বিনিয়োগ বা ইনওয়ার্ড ফরেন ইনভেস্টমেন্ট। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের কোনো ব্যবসায়ী যখন বিশ্বের অন্য কোনো দেশ বা অঞ্চলে ব্যবসা পরিচালনা বা উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ থেকে অর্থ নিয়ে সেখানে বিনিয়োগ করবে, তখনো সেটা বৈদেশিক বিনিয়োগের আওতায় পড়বে। তবে সেটি হবে বহির্মুখী বৈদেশিক বিনিয়োগ বা আউটওয়ার্ড ফরেন ইনভেস্টমেন্ট। এ কারণেই বৈদেশিক বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ বা নিট ফরেন ইনভেস্টমেন্টের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। কেননা প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব যে সত্যিকার অর্থেই দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে কি না এবং কী পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে। প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ যখন ধনাত্মক বা পজিটিভ হয়, তখনই দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়ে থাকে।
বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদনব্যবস্থা, সরবরাহ নেটওয়ার্ক বা সাপ্লাই চেইন যেমন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি বিনিয়োগও এখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। মূলধন বা আর্থিক বিনিয়োগ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিনিয়োগ এখন বিভিন্ন দেশে এবং অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। যে দেশ বা অঞ্চলে ব্যাবসায়িক সুযোগ বেশি থাকে, সেখানে বিনিয়োগ জেঁকে বসে। এ কারণেই দেখা যায় কোনো এক বছর এক দেশে বা অঞ্চলে অধিক বিনিয়োগ হলেও পরের বছর সেটি নাও হতে পারে এবং বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। তবে যদি কোনো বছর বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ সেভাবে সম্প্রসারিত না হয়, তাহলে সে বছর বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় না। যখন বেশির ভাগ দেশে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ ধনাত্মক না হয়, তখনই এ রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে যখন বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় তখনই বিশ্বে সার্বিকভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। বিশ্বে বৈদেশিক বিনিয়োগের হ্রাস-বৃদ্ধির হিসাব অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা সংরক্ষণ করে এবং প্রতিবছর এর ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মধ্যে জাতিসংঘের প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর তথ্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে জাতিসংঘ বিশ্বের বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর তথ্য প্রকাশ করেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০২৫ সালে বিশ্বে সার্বিকভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ ৬% বৃদ্ধি পেয়ে ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির বেশির ভাগই হয়েছে উন্নত বিশ্বে। বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাত্র ২% পেয়েছে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আমেরিকা বরাবরের মতো প্রথম স্থানেই অবস্থান করছে, যদিও তাদের দেশে এই বিনিয়োগ ২০২৪ সালের ২৮৪ বিলিয়ন ডলার থেকে হ্রাস পেয়ে ২৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চীনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তারা ২০২৫ সালে ১০৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ পেলেও সেটা ২০২৪ সালের ১১৬ বিলিয়ন ডলার থেকে হ্রাস পেয়েছে। অঞ্চল হিসেবে ইউরোপ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ভালো সুবিধা নিতে পেরেছে। কেননা ইউরোপে ২০২৪ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২০৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৫ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শুধু ব্রাজিল ও ভারত ভালো অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগ পেয়েছে ২০২৫ সালে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও আমাদের দেশ এর ছিটেফোঁটাও আনতে পারল না কেন। অথচ ২০২৫ সালে আমাদের দেশেই তো সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ আসার কথা ছিল। কেননা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এক সরকারকে সরিয়ে দায়িত্বে ছিলেন এক অন্তর্বর্তী সরকার, যার প্রধান আবার ছিলেন নোবেলবিজয়ী ক্ষুদ্রঋণ বিশেষজ্ঞ। উন্নত বিশ্বে উনার পরিচিতি এবং নেটওয়ার্ক বেশ শক্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হয়ে অনেক আশার কথাও তিনি দেশবাসীকে শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দেশে অঢেল বিনিয়োগ হবে, প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে, চাকরির বন্যা বয়ে যাবে, আরো অনেক আশার কথা। বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার দায়িত্বে থাকা সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন আরেক প্রবাসী আর্থিক বিশেষজ্ঞকে। তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন যে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানানো হবে। সিঙ্গাপুর তো দূরের কথা, দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো পিছিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে।
বিগত দুই বছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ তো আসেইনি, দেশীয় বিনিয়োগও সেভাবে হয়নি। ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এক ধরনের আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে তাঁরা বিনিয়োগ করার মনোবল ও উৎসাহ, দুটোই হারিয়ে ফেলেছেন। অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে যে বিনিয়োগ হয় না, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে গত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে। এর সঙ্গে এবার নতুন করে যোগ হয়েছে মব সন্ত্রাস করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রমণ করা এবং ব্যবসায়ীদের আতঙ্কের মধ্যে রাখা। এই যেখানে অবস্থা, সেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগ তো অনেক পরের কথা, দেশীয় বিনিয়োগই তো হবে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ব্যবসা-বাণিজ্য
- বৈদেশিক বিনিয়োগ