বাংলাদেশের পানিনিরাপত্তায় পদ্মা ব্যারাজের কোনো বিকল্প নেই

প্রথম আলো মো. সিরাজুল ইসলাম প্রকাশিত: ২৮ মে ২০২৬, ১৮:১৯

সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে মতদ্বৈততা–সংবলিত লেখাগুলো পড়লাম। আসলে পানির ওপর নির্মিত যেকোনো অবকাঠামো পরিবেশ, তথা জনজীবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে; বিশেষ করে আপনি যখন একটি বদ্বীপ অঞ্চলে বাস করছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাস্তবতার নিরিখে লাভ-ক্ষতির এই বিশ্লেষণ করতে হবে।


২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট প্রথম আলোয় আমি লিখেছিলাম, ‘ভারতের সঙ্গে চুক্তিতে কেন সমাধান সম্ভব নয়, নিজেরা বাঁধ দিলে কী হবে?’। বাঁধ কী, কাকে বলে, বাঁধের ধরনসহ বিস্তারিত বর্ণনা ছিল এতে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পানিচুক্তি নিয়ে দুটিসহ প্রথম আলোয় পানি নিয়ে আমার অন্তত পাঁচটি লেখা আছে।


আমার ধারণা, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকেরই পানি–সম্পর্কিত কিছু সাধারণ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। শুধু তা–ই নয়, আমাদের পাঠ্যপুস্তকে এ বিষয়ে আরও জোর দেওয়া উচিত। প্রয়োজন সুশীল সমাজের মধ্যে এ নিয়ে আরও বিস্তারিত জ্ঞানভিত্তিক আলোচনাও।


হাজার বছরের নদীর বয়ে চলার ইতিহাসের তুলনায় নদী ব্যবস্থাপনা আর নদীতে আধুনিক স্থাপনা নির্মাণের ইতিহাস কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়—মাত্র কয়েক শ বছরের। নদীর আড়াআড়ি ‘ড্যাম’ নির্মাণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, তথা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা ‘ব্যারাজ’ নির্মাণ করে পানির গতিপথ পরিবর্তন—এ দুটি স্থাপনা নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা হয়ে থাকে।


মানুষের প্রয়োজনেই কিন্তু এই প্রযুক্তিগুলো উদ্ভাবন, আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে পৃথিবীর অনেক দেশে ড্যাম কিংবা ব্যারাজ ভেঙেও ফেলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই প্রায় ২ হাজার ৪০০টি ড্যাম কিংবা ব্যারাজ ভেঙে ফেলছে।


কিন্তু তারপর সেখানে রয়ে গেছে আরও প্রায় ৯২ হাজার ড্যাম কিংবা ব্যারাজ। বলা হয়ে থাকে, ১৯২০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসত জলবিদ্যুৎ থেকে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচব্যবস্থাও গড়ে উঠেছিল এই অবকাঠামোগুলোর ওপর ভিত্তি করে। জাপানের কথাই ধরা যাক। সরু-লম্বা একটি  দ্বীপরাষ্ট্র। মাঝখানে উঁচু পাহাড়। নদীগুলো সেই পাহাড়ে উৎপত্তি হয়ে সাগরে গিয়ে পড়েছে, কিন্তু দৈর্ঘ্যে খুবই ছোট। পানির ধর্ম গড়িয়ে নিচে যাওয়া। ফলে সপ্তাহখানেক বৃষ্টি না হলে অধিকাংশ নদী সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ার কথা।


আর সে সমস্যার সমাধানে পাহাড়ে তিন হাজারের মতো বাঁধ নির্মাণ করে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা বাকি সময় ধীরে ধীরে ছেড়ে তারা পানি সমস্যার সমাধান করেছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহার করা হয় এই স্থাপনাগুলো। চীনের কথা নয় বাদই দিলাম, যেখানে এক লাখের মতো এ ধরনের বাঁধ আছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চিত্রই–বা কেমন? প্রায় ৫ হাজার ৩০০টি ড্যাম কিংবা ব্যারাজ সেখানে এখনো কার্যকর।


সে তুলনায় বাংলাদেশে কয়টি ড্যাম আর ব্যারাজ আছে? সাকল্যে পাঁচটি। বড় দুটি—তিস্তা ব্যারাজ আর কাপ্তাই ড্যাম। তাহলে বাংলাদেশে নদী ব্যবস্থাপনা অপ্রয়োজনীয়ভাবে স্থাপনানির্ভর—এটি বলা যাবে কি না? হ্যাঁ, তারপরও প্রশ্ন থাকে সঠিক জায়গায়, সঠিক স্থাপনাটি নির্মাণ করা হচ্ছে কি না?  


বিশেষ করে এই মুহূর্তের ‘টক অব দ্য টাউন’ পদ্মা ব্যারাজের ব্যাপারে এ প্রশ্নগুলো সবাই জানতে চাইছেন। এটা ঠিক যে এই মুহূর্তে এটি নিয়ে সিরিয়াস মন্তব্য করার মতো অবস্থায় আমরা নেই। কেননা, এর বিস্তারিত ডিজাইন আমরা জানি না। ফলে যেটুকু জানা গেছে, তার ওপর কিছু মন্তব্য করা যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এবং বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার বাস্তবতার নিরিখে, মোটাদাগে প্রকল্পটি অবশ্যই প্রয়োজনীয়, এটা বলতে দ্বিধা নেই। সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে কিছু বিষয় উল্লেখ করছি।


১. ব্যারাজটির পরিবেশগত প্রভাব: হ্যাঁ, বিশ্বব্যাপী পরিবেশবিদেরা নদীতে স্থাপনা নির্মাণ পছন্দ করেন না, যদি–না একেবারেই প্রয়োজনীয় না হয়। তবে বাংলাদেশের জন্য এর বিকল্প ছিল না। এই পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হচ্ছে উজানে ভারত ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করছে বলেই। ফারাক্কা বাঁধ না থাকলে পদ্মা ব্যারাজের আসলে কোনো প্রয়োজনীয়তাই ছিল না। এর পরিবেশগত সমীক্ষাটি হাতে পেলে আরও ভালো হতো।


তবে দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোয় গত বছরগুলোতে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পানি কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। লবণাক্ততার প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। ‘টপ ডাইং’ রোগে আক্রান্ত হয়ে সেখানে মারা যাচ্ছে সুন্দরীগাছ। পদ্মা ব্যারাজের ফলে এ অবস্থার উন্নতি হবে নিশ্চিত। তা ছাড়া এই ব্যারাজে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, যথা নেভিগেশন লক, ফিশ পাস ও সিলট ফ্লাশিংয়ের ব্যবস্থা আছে, যা ব্যারাজের দ্বারা সৃষ্ট পরিবেশগত সমস্যা অনেকটা কমিয়ে দেবে।


২. ব্যারাজের অবস্থান: এর অবস্থান নিয়ে খুব বেশি গবেষণার সুযোগ নেই। সীমান্ত থেকে যমুনার সংযোগস্থল-পদ্মা বরাবর—এ দুইয়ের মাঝেই এটি নির্মাণ করতে হবে। বেশি উজানে গেলে জলাধারের ধারণক্ষমতা কমে যাবে। আবার এটি অবশ্যই গড়াই-মধুমতীর উৎসমুখের ভাটিতে হতে হবে। কেননা, ব্যারাজে পানি উঁচু করে গড়াই দিয়ে তা প্রবাহিত করতে হবে। অন্যদিকে বেশি ভাটিতে গেলে ব্যারাজটি অনেক উঁচু করতে হবে। তা না হলে উজানের শাখানদীগুলোয় পানি ঢুকবে না।


সুতরাং বর্তমান অবস্থানটি অনেক সমীক্ষার পরই নিশ্চিত করা হয়েছে। বহু বছর ধরেই অবস্থানটিকে সবচেয়ে যোগ্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।


৩. ‘পজিটিভ সাম গেম’ বনাম ‘জিরো সাম গেম’–এর একটি প্রসঙ্গ আসছে। ফারাক্কার পরে বাংলাদেশ সীমান্ত, সুতরাং ভাটির ক্ষতি শুধু বাংলাদেশের, আর উজানের লাভ সব ভারতের। সুতরাং ‘পজিটিভ সাম গেম’। কিন্তু পদ্মা ব্যারাজের ভাটিতেও তো বাংলাদেশই। ফলে উজানের লাভ আর ভাটির ক্ষতি—দুই বাংলাদেশের। তা ছাড়া একই নদীর পানি একবার জমানো হচ্ছে, আরেকবার ছাড়া হচ্ছে। সুতরাং ‘জিরো সাম গেম’। হ্যাঁ, এটা সত্য।


জেনে রাখা ভালো, ফারাক্কার উজানে গঙ্গা নদীতে ভারতের ভেতরে আরও প্রায় ৩০০টি ছোট-বড় বাঁধ আছে। বিভিন্ন দেশে যে হাজার হাজার ড্যাম আর ব্যারাজের কথা বললাম, এর সব কটিই দেশের অভ্যন্তরে, অর্থাৎ ‘জিরো সাম গেম’। ড্যাম কিংবা ব্যারাজ এভাবেই কাজ করে। ভরা মৌসুমে পানি জমা রাখে আর শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহার করে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও