প্রাক-বাজেট ভাবনায় ক্ষুদ্রঋণ
অর্থনীতির অন্যতম রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা হচ্ছে ঋণ। একটি দেশের অর্থনীতিতে সঞ্চয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সেই সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করার জন্য কার্যকর ঋণব্যবস্থাও অপরিহার্য। এর প্রধান কারণ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত সঞ্চয় বা আমানত যখন কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ আকারে পৌঁছে যায়, তখনই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, উৎপাদন বাড়ে এবং অর্থনীতিতে গতি আসে।
প্রাক-বাজেট ভাবনায় ব্যাংক ঋণ বা ক্ষুদ্রঋণ আলাদাভাবে ভাবতে হচ্ছে। কারণ, এমন একসময় আগামী বাজেট আসছে, যখন দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিু পর্যায়ে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো ক্রমেই বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে ট্রেজারি বন্ড ও বিলে, পুঁজিবাজারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে-কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে? এ বাস্তবতায় ক্ষুদ্রঋণ খাতকে নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ কোটি টাকা। আগের বছর এটি ছিল ১৮.৮৩ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আমানত বেড়েছে ১১.৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ এক বছরের ব্যবধানে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৫.৩৮ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ৩.৮২ লাখ কোটি টাকা। ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮.০৯ লাখ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশ বেশি। নিশ্চিত মুনাফার কারণে ব্যাংকগুলো এখন ব্যবসায়িক ঋণ দেওয়ার বদলে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। একদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে একুশ বছরের মধ্যে সর্বনিু পর্যায়ে নেমে এসেছে, অন্যদিকে সরকারের ঋণগ্রহণ ২৪ শতাংশ বেড়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমাও ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে মৌলিকভাবে বদলে যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর আয়ের কাঠামোও। পরিচালন আয়ের বড় অংশ এখন প্রথাগত ঋণের বদলে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আসছে।
বলতে দ্বিধা নেই, এ প্রবণতা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতোমধ্যেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শিল্প বিনিয়োগের অন্যতম সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ১০.৪৩ শতাংশ কমেছে। সরকারি ঋণের প্রায় ৬৭ শতাংশ এখন ব্যাংকগুলো ধারণ করছে। ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) ১.৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সর্বনিু ১২.৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে ‘ক্রাউডিং আউট’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যায়, যা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ট্রেজারি আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতা শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমিয়ে দেবে।
কর্মসংস্থানের গতি কমে গেলে নিঃসন্দেহে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়ায়। বিশ্বব্যাংক বলছে, গত চার বছর ধরে দেশে দরিদ্রের হার বাড়ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়াই এর মূল কারণ বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।
নতুন সরকার অর্থনীতিতে চাঙাভাব আনার জন্য ইতোমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষি খাত, কর্মসংস্থান এবং ডিজিটালাইজেশনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাত অন্যতম প্রধান ভিত্তি, জিডিপিতে যার অবদান প্রায় ১১১৩ শতাংশ। প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এ কৃষি খাত, একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করে। শিল্প ও সেবা খাতের প্রসারের কারণে জিডিপিতে এর অবদান ক্রমশ কমলেও গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসাবেই কৃষি এখনো দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
কিন্তু দেশে মোট বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ২ শতাংশ কৃষি খাতে যায়। আবার কৃষি খাতে বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশই যায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) মাধ্যমে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালে তারা ৩ কোটি ২১ লাখ ঋণগ্রহীতার মাঝে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। সহজ ভাষায় বললে, গ্রামীণ ও কৃষি অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রাক-বাজেট আলোচনা