বাংলাদেশের শিক্ষায় এআই : সম্ভাবনা ও সংকট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) আজ আর কেবল প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের গবেষণাগারের বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, কর্মক্ষেত্রে, চিকিৎসায়, কৃষিতে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষায়। বিশ্বের প্রতিটি কোণে এআই এখন পরিবর্তনের ঢেউ তুলছে, আর বাংলাদেশও এ বৈশ্বিক রূপান্তরের বাইরে নয়। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সামনে এআই একদিকে যেমন অভূতপূর্ব সুযোগের দরজা খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই সামনে রাখছে গভীর চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্নও। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ম্যাককিন্সি গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করতে পারে। এটি শুধু পরিসংখ্যান নয়-বরং ইঙ্গিত দিচ্ছে, শিক্ষার ভবিষ্যৎ রূপটি এআই ছাড়া আর কল্পনা করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এআই-এর গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে দেশের শিক্ষা পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্তরে পড়াশোনা করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার এখনো উদ্বেগজনক; বিশেষত মেয়েদের মধ্যে এবং গ্রামীণ এলাকায়। শিক্ষকের অভাব, মানসম্পন্ন পাঠ্যসামগ্রীর সংকট এবং ভৌগোলিক বৈষম্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ঘা; ঠিক এ জায়গাগুলোতেই এআই হতে পারে একটি কার্যকর হাতিয়ার।
এআইচালিত শিক্ষা পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ব্যক্তিগত শিক্ষার সুযোগ। একটি প্রচলিত শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক একসঙ্গে পঞ্চাশ শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন-সবার শেখার গতি আলাদা, বোঝার ধরন আলাদা, কিন্তু পাঠদান একই। এআই এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে। খান একাডেমির মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, এআইভিত্তিক অ্যাডাপটিভ লার্নিং সিস্টেম প্রতিটি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করে তার জন্য আলাদা পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে কিছু স্থানীয় উদ্যোগ এ পথে হাঁটছে। ‘শিক্ষক.কম’, ‘১০ মিনিট স্কুল’ এবং অন্যান্য অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম কোভিড মহামারির পর থেকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ১০ মিনিট স্কুলের তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ৬০ লাখেরও বেশি নিবন্ধিত ব্যবহারকারী রয়েছে, যা প্রমাণ করে ডিজিটাল শিক্ষার প্রতি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কতটা তীব্র।
শিক্ষকদের কাজকেও এআই সহজ করতে পারে উল্লেখযোগ্যভাবে। পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন, উপস্থিতি ট্র্যাক করা, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির প্রতিবেদন তৈরি করা-এসব কাজ এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারে; ফলে শিক্ষকরা আরও বেশি সময় দিতে পারবেন প্রকৃত পাঠদানে ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানবিক যোগাযোগে। বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এখনো আদর্শ মানের অনেক নিচে-কিছু জেলায় একজন শিক্ষকের বিপরীতে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থীও রয়েছে। এআই এ ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে না পারলেও অনেকাংশে কমাতে করতে পারে। ভাষার বাধাও এআই ভাঙতে পারে। বাংলাদেশের প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীরা, বিশেষত পাহাড়ি অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ পায় না বললেই চলে। এআইচালিত অনুবাদ ও বহুভাষিক শিক্ষাসামগ্রী এ বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ইতোমধ্যে গুগল, মেটা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষায় এআই মডেল উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত।
বাংলাদেশ সরকারও এআইকে শিক্ষায় সংযুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ ভিশনের আওতায় ডিজিটাল শিক্ষার অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ৬৫০টিরও বেশি সরকারি বিদ্যালয়ে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত সারা দেশে ৩৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে, যদিও সংযোগের গুণগত মান ও গতি এখনো একটি বড় প্রশ্ন। তবে এআই-এর ব্যবহার কেবল সুবিধার গল্প নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর উদ্বেগও। শিক্ষা খাতে এআই-এর সবচেয়ে আলোচিত সমস্যাগুলোর একটি হলো একাডেমিক অসততা। চ্যাটজিপিটি, গুগল, জেমিনি ও অন্যান্য জেনারেটিভ এআই টুল শিক্ষার্থীদের হাতে এমন একটি হাতিয়ার দিয়েছে, যা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে রচনা, গবেষণাপত্র বা গৃহকর্ম তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইতোমধ্যে এআই জেনারেটেড অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহারের নীতিমালা প্রণয়নের কথা ভাবছে, কিন্তু এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো জাতীয় নির্দেশিকা তৈরি হয়নি।
এআই-এর ওপর অতিনির্ভরতা শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা কমিয়ে দিতে পারে-এ আশঙ্কাটি বিশেষজ্ঞ মহলে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। যখন একটি যন্ত্র সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়, তখন নিজে ভেবে সমাধান খোঁজার অভ্যাস ও ক্ষমতা দুটোই দুর্বল হয়ে পড়ে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, বিশ্লেষণ করা, প্রশ্ন করা, সৃষ্টি করা। এআই যদি এ প্রক্রিয়াটিকে শর্টকাট করে দেয়, তাহলে শিক্ষার প্রকৃত মান হুমকিতে পড়বে। ডিজিটাল বিভাজন বা ডিজিটাল ডিভাইড বাংলাদেশের জন্য এআই প্রসারের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি ছাড়িয়ে গেলেও গ্রামীণ এলাকায় স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের প্রকৃত সুবিধা এখনো সীমিত। যেখানে ঢাকার কোনো ধনী পরিবারের সন্তান সর্বাধুনিক এআই টুল ব্যবহার করে পড়াশোনা করছে, সেখানে হাওড়ের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের শিশু বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অভাবে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এআই যদি এ বৈষম্যকে সমাধান না করে বরং আরও গভীর করে, তাহলে তা সমাজের জন্য উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করবে। তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। এআই সিস্টেমগুলো শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে বিপুল তথ্য সংগ্রহ করে-তাদের শেখার ধরন, দুর্বলতা, আচরণ, এমনকি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাও। বাংলাদেশে এখনো একটি শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে এ তথ্যগুলোকে সংগ্রহ করছে, কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে এবং কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে জবাবদিহির কোনো কাঠামো নেই। শিশুদের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর।