আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অদৃশ্য নজরদারি
বেইজিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে বহনকারী বিখ্যাত ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ বিমানটি ওড়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু তখনই রানওয়েতে ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। পুরো মার্কিন প্রতিনিধিদল তাদের সফরে চীনা আতিথেয়তায় পাওয়া আকর্ষণীয় সব উপহার, মূল্যবান স্মারকসামগ্রী, মেডেল, ব্যাজ এমনকি ছোট ছোট পিনও বিমানবন্দরের ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে এ আচরণকে চরম কূটনৈতিক অশিষ্টতা মনে হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের দুনিয়ায় এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি অত্যন্ত সুনিপুণ ও কঠোর এক সিকিউরিটি প্রটোকলের অংশ।
আজকের দিনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের দেওয়া উপহার কখনোই শুধু একটি ‘উপহার’ নয়; এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে পরিশীলিত ও বিপজ্জনক গুপ্তচরবৃত্তি। ট্রোজান হর্স ও প্যাসিভ অডিও সার্ভেইলেন্স : ব্যাটারিহীন আড়িপাতার প্রযুক্তিকে বলা হয় Passive resonant cavity bug। এর ভেতরে কোনো দৃশ্যমান ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, তার বা ব্যাটারি থাকে না। ফলে সাধারণ কোনো মেটাল ডিটেক্টর বা সিকিউরিটি চেকিংয়ে একে সাধারণ ধাতব পিন বা স্মারক বলেই মনে হবে। কিন্তু বাইরে থেকে যখন একটি নির্দিষ্ট রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা মাইক্রোওয়েভ সিগন্যাল এ পিনের দিকে পাঠানো হয়, তখন পিনের ভেতরের বিশেষ রেজোন্যান্ট কাঠামোটি ঘরের ভেতরের শব্দের কম্পনের সঙ্গে কাঁপতে থাকে। এ কম্পনসহ সিগন্যালটি যখন প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায়, তখন দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে ঘরের ভেতরের সব গোপন কথোপকথন স্পষ্ট শোনা সম্ভব হয়।
চালের দানার চেয়ে ক্ষুদ্র ট্র্যাকিং চিপ ও ‘বার্নার’ ফোন
উপহারসামগ্রীর ভেতরে শুধু আড়িপাতার যন্ত্রই নয়, বরং চালের দানার চেয়েও ছোট ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আরইআইডি (রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি আইডেনটিফিকেশন) বা এনএফসি চিপ লুকিয়ে রাখা সম্ভব। এগুলোর জন্য কোনো নিজস্ব পাওয়ার সোর্সের প্রয়োজন হয় না। নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির স্ক্যানারের আওতায় এলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে ভবনের ভেতরে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সুনির্দিষ্ট মুভমেন্ট ট্র্যাক করা যায়। এ একই সাইবার ঝুঁকির কারণে চীন বা রাশিয়া সফরে আমেরিকান প্রতিনিধিদলের কেউ নিজেদের ব্যক্তিগত ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করতে পারেন না। মার্কিন ডিরেক্টরেট অব ন্যাশনাল সিকিউরিটি এবং সিআইএ কর্মকর্তাদের জন্য সেখানে বার্নার বা অস্থায়ী ডিভাইস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। তাই কর্মকর্তারা তাদের আসল ডিভাইসগুলো যুক্তরাষ্ট্রেই রেখে যান। সফরে সম্পূর্ণ নতুন বা বিশেষায়িত ল্যাপটপ ও ফোন দেওয়া হয়। কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানানো ‘কাউন্টার-মেজার্স’ বা প্রতিরোধব্যবস্থা
মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ধরে নেয় যে, শুধু উপহারই নয়, প্রতিপক্ষের দেশের হোটেলকক্ষ, চেয়ার, টেবিল, জানালা বা খাবারের মাধ্যমেও এ নজরদারি করা সম্ভব। আর এ অদৃশ্য নজরদারি এড়াতে তারা যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়, তা যে কোনো সায়েন্স-ফিকশন সিনেমাকেও হার মানায়।
ক. দ্য ট্যাকটিক্যাল এসসিআইএফ এবং বিশেষ চেয়ার
প্রেসিডেন্ট পৌঁছানোর কয়েকদিন আগেই মার্কিন অগ্রবর্তী দল পুরো হোটেল বা কনফারেন্স ভেন্যু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তারা থার্মাল ইমেজিং এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি স্ক্যানার দিয়ে দেওয়াল ও আসবাবপত্রের প্রতিটি ইঞ্চি পরীক্ষা করে। এমনকি প্রতিপক্ষের দেওয়া চেয়ারের নিচে কোনো প্রেসার-সেন্সর বা চিপ এড়াতে অনেক সময় তারা নিজেদের সঙ্গে আনা বিশেষ চেয়ার বা কুশন ব্যবহার করেন। সবচেয়ে সংবেদনশীল আলোচনার জন্য তারা হোটেলকক্ষের ওপর মোটেও ভরসা করেন না। মার্কিন নিরাপত্তাদল হোটেলের কোনো বড় কক্ষে একটি অস্থায়ী ‘তাঁবু’ বা ‘কাচের ঘর’ তৈরি করে। একে বলা হয় ট্যাকটিক্যাল এসসিআইএফ (সেনসেটিভ কমপার্টমেন্টাল ইনফরমেশন ফ্যসিলিটি)। এটি এমন একটি শব্দভেদ্য এবং তরঙ্গভেদ্য কাঠামো, যার ভেতরে কোনো রেডিও সিগন্যাল ঢুকতেও পারে না, বের হতেও পারে না।
খ. লেজার অডিও নজরদারি ও হোয়াইট নয়েজ
রুমে কোনো চিপ না থাকলেও বহুদূর থেকে জানালার কাচের দিকে লেজার রশ্মি নিক্ষেপ করে ভেতরের কথাবার্তা শোনা সম্ভব। ঘরের ভেতরের শব্দের কম্পনে জানালার কাচ যেভাবে কাঁপে, লেজার সেই কম্পন পরিমাপ করে আওয়াজ উদ্ধার করে। এর জবাবে মার্কিন সিকিউরিটি টিম জানালায় বিশেষ ধরনের ভারী পর্দা এবং অডিও জ্যামার বা হোয়াইট নয়েজ জেনারেটর ব্যবহার করে, যা জানালার কাচকে একটা নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে অনবরত কাঁপাতে থাকে। ফলে বাইরের লেজার মাইক্রোফোনে কেবল একটি একটানা ভনভন শব্দ ছাড়া আর কিছুই ধরা পড়ে না।
গ. বায়োমেট্রিক চুরি ও খাবারের নিরাপত্তা
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত পানির গ্লাস, কাপ বা ন্যাপকিন থেকে তার ডিএনএ সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে পারে। যাতে তার কোনো গোপন শারীরিক অসুস্থতা বা জেনেটিক দুর্বলতা আছে কিনা তা জানা যাবে। তাই প্রেসিডেন্ট ডাইনিং টেবিল বা রুম ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে সিক্রেট সার্ভিসের একটি বিশেষ দল তার ব্যবহৃত গ্লাস, চামচ বা ন্যাপকিন প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেয়। এগুলোকে কখনো হোটেলের স্টাফদের পরিষ্কার করতে দেওয়া হয় না। এমনকি বিদেশ সফরে প্রেসিডেন্ট কী খাবেন, তা নির্ধারণ করতে হোয়াইট হাউজের নিজস্ব শেফ এবং রন্ধনশিল্পী সঙ্গে যান এবং অধিকাংশ খাবার ও পানি ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ থেকেই সরবরাহ করা হয়।