মাদ্রাসায় যৌন সহিংসতা সিস্টেমের ব্যর্থতা: ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী

www.ajkerpatrika.com সাজ্জাদ সিদ্দিকী প্রকাশিত: ১০ মে ২০২৬, ১১:১৮

ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যান। তিনি নরওয়ের বারগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল এবং অস্ট্রেলিয়ার নিউ ইংল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাইব্রিড পিসবিল্ডিংয়ের ওপর পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষক কর্তৃক নারী শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ এবং প্রতিকারের উপায় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার সঙ্গে।


প্রায়ই মাদ্রাসায় ধর্ষণের ঘটনা খবরে আসছে, ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখছেন? মাদ্রাসাসংশ্লিষ্ট অনেকেই বলার চেষ্টা করে, এগুলো ষড়যন্ত্র। আসলেই কি তাই?


ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী: এই ধরনের অপরাধের খবর বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি সমাজতাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, আবাসিক মহিলা মাদ্রাসার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তৃতি। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা অবকাঠামো ছাড়াই কেবল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভাড়া বাড়িতে এসব মাদ্রাসা গড়ে উঠছে। দ্বিতীয়ত, তদারকির অভাব। মূলধারার স্কুল বা কলেজের মতো এখানে সরকারি বা শক্তিশালী কোনো বোর্ডের নিয়মিত নজরদারি নেই। তৃতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ঘটনাগুলো দ্রুত সামনে আসছে। আগে অনেক ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হলেও এখন সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় এই ধরনের সংবাদ দ্রুত প্রকাশ পাচ্ছে এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো অপরাধীর মনে বিচারহীনতার ‘আশ্বাস’।


কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন, বিপরীতে তা অস্বীকার—উভয়ই নাগরিক অধিকার। তবে সংঘবদ্ধ চক্রের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় কিংবা প্রকৃত অপরাধীর অস্বীকারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত। একমাত্র সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই সত্য উদ্‌ঘাটন এবং সংশয় দূর করা সম্ভব।


অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা এই ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। নেত্রকোনার মদন উপজেলায় শিক্ষকের ধর্ষণে ১১ বছরের এক ছাত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর স্থানীয় হজরত ফাতেমাতুজ জোহুরা মহিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক। গত বছরের নভেম্বরে ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন ও অসুস্থতা দেখা দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, মারাত্মক রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক গঠনগত অপূর্ণতার কারণে শিশুটির জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে। সম্প্রতি আরও কিছু এ ধরনের ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এর বিপরীতে আরও একটা ঘটনার সংবাদ আমাদের সামনে এসেছে। ২০১৯ সালে ফেনীর পরশুরামে এক কিশোরীকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় এক মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদকে (২৫)। এক মাসের বেশি সময় কারাভোগ করেন সেই ইমাম। সম্প্রতি আরেক ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হয়। কিশোরীর সহোদর দীর্ঘদিন তাকে ধর্ষণ করে আসছিল। সামাজিক লজ্জা ও অপরাধ আড়াল করতে পরিবার পরিকল্পিতভাবে ওই ইমামকে অভিযুক্ত করে। পুলিশি তদন্ত ও বৈজ্ঞানিক ডিএনএ পরীক্ষায় সত্য উদ্‌ঘাটিত হওয়ার পর ইমামকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং ভাইকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এটি বিচারব্যবস্থায় অনেক মিথ্যা মামলার সত্য উন্মোচনের সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ।

ধর্মীয় শিক্ষার আবহে থেকেও একজন শিক্ষক যখন এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তখন কি সেটা নিছক ব্যক্তির স্খলন, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা?


ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী: প্রথমত, যেকোনো অপরাধের মূলে ব্যক্তিগত স্খলন দায়ী। অপরাধপ্রবণতা এবং স্বার্থপরতা মানুষের একধরনের সহজাত প্রবৃত্তি বা ‘বেসিক ইন্সটিঙ্কট’। সেই অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হয় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং সিস্টেম তথা কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে। আর সে কাজটা বাস্তবায়ন করতে হয় যথাযথ আইনের মাধ্যমে। তবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষালয়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো। একজন শিক্ষক বা ইমাম যখন জানবেন যে তাঁর প্রতিটি কাজ একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামোর অধীনে রয়েছে, তখন তিনি এই ধরনের জঘন্য অপরাধে জড়িত হওয়ার আগে কয়েকবার ভাববেন। কিন্তু প্রায় সব মহিলা মাদ্রাসাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং পুরুষ নিয়ন্ত্রিত। কার্যত কোনো পরিচালনা পর্ষদ নেই। অনেক ক্ষেত্রে, এই ‘একনায়কতান্ত্রিক’ কাঠামো একজন ব্যক্তিকে অপরাধী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। ধর্মীয় পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও মানুষের আদিম প্রবৃত্তি বা অপরাধপ্রবণতা জাগ্রত হতে পারে, যদি সেখানে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ না থাকে। সুতরাং এটি নিছক ব্যক্তির দোষ নয়, বরং সিস্টেমের ব্যর্থতা।


মাদ্রাসার অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। মাদ্রাসাগুলোতে এমন কী ব্যাপার আছে যেটা, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করতে বাধা দেয়?


ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী: মাদ্রাসার নেতিবাচক ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেওয়া হয়—এই অভিযোগের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত নই। বরং অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসার ঘটনা অন্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আজকাল অধিক প্রচারিত হয়। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ না করার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো ধর্মীয় ভাবাবেগ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসহায়ত্ব। প্রতিষ্ঠানের তথাকথিত ‘পবিত্রতা’ ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয় কিংবা ‘ওস্তাদের অবাধ্য হওয়া গুনাহ’—এ জাতীয় ধর্মীয় অপব্যাখ্যা অনেক সময় ভুক্তভোগীকে সত্য প্রকাশে বাধা দেয়। এ ছাড়া মাদ্রাসার পরিচালক বা শিক্ষকেরা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, প্রতিবাদ করে কোনো সুফল মিলবে না। সর্বোপরি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীলতা ও শিক্ষকের প্রতি ঐতিহ্যগত অগাধ ভক্তির সুযোগ নিয়ে যখন অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটে, তখন প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক ‘সম্মানহানি’র ভীতিই প্রতিকার চাওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।


বেশির ভাগ মাদ্রাসাশিক্ষার্থী অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এবং রক্ষণশীল পরিবারের সদস্য। তাদের অনেকে মনে করতে পারে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা জানাজানি হলে তাদের বিয়ের ক্ষেত্রে বাধা হবে কিংবা পরিবার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে পড়বে। এমনকি, ধর্মীয় ভাবমূর্তি রক্ষার অজুহাতে পরিবার বা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী অনেক সময় এই ধরনের ঘটনার ন্যায়বিচারের তোয়াক্কা না করে অভ্যন্তরীণভাবে আপস করার চেষ্টা করে।


সামাজিক সম্মান ও কুসংস্কার এই ক্ষেত্রে অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের সমাজে এখনো যৌন সহিংসতার শিকার নারীকে দোষারোপ করার প্রবণতা তীব্র। কখনো কখনো কেউ কেউ এই বিষয়টিকে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। যদিও এমন ঘটনার সংখ্যা খুব বেশি নয়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব আসল ভিকটিমদের নিরুৎসাহিত করার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।


এ ধরনের ঘটনা সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে বাধা। আমি মনে করি, মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। ফলে তা সত্যিকারের ভিকটিমকে সাহস জোগাবে অভিযোগ প্রকাশ করতে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও