সংরক্ষিত বনও কি সংরক্ষিত থাকবে না
সংরক্ষিত বন বলতে এমন বনকে বোঝায়, যেখানে বন আইনত সংরক্ষিত। সংরক্ষিত বনে গাছ কাটা, পশুপালন, শিকার বা যেকোনো ধরনের বনজ সম্পদের ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ। বন আইন, ১৯২৭ অনুসারে সরকার যেকোনো জমিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। এই আইনের ২০ ধারায় ঘোষিত বনকে সংরক্ষিত বন বলা হয়।
বাংলাদেশে মোট বনভূমির ১০.৭ শতাংশ সংরক্ষিত। এগুলোর মধ্যে প্রধান সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলো হলো সুন্দরবন (পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ), সাঙ্গু বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ইত্যাদি। সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, মধুপুর বন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান, নিঝুম দ্বীপ ইত্যাদি। এ ছাড়া বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা রয়েছে।
যেমন—রাতারগুল বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা, আলতাদীঘি বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা, পূর্বাচল বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা ইত্যাদি। এই সব সংরক্ষিত এলাকায় নানাভাবে চলছে দখল, বৃক্ষ কর্তন ও পশুপাখি নিধন। কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের অপরাধে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর নিকটবর্তী অন্যতম প্রাকৃতিক বনভূমি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান নিয়ে একটি সংবাদ অনেকেরই নজরে এসেছে। সেখানে সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বর্জ্যের ভাগাড় নির্মাণ শুরু করে। বন বিভাগের তথ্য মতে, সিটি করপোরেশনের প্রায় ২০০ লোক জাতীয় উদ্যানের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে বালু মাটি ভরাট শুরু করে। কাজ বন্ধ না হলে এক পর্যায়ে বন বিভাগ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। পরে উদ্যানের ভেতর ময়লা-আবর্জনার ডাম্পিং জোন স্থাপন ও শেড নির্মাণের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয় সরকার। কিন্তু অন্যান্য সংরক্ষিত বনেও নানা বসতি নির্মাণ, বৃক্ষ কর্তন ইত্যাদি কাজ চলছে।
গত ১ মে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং বিট এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে নির্মাণকৃত বসতি উচ্ছেদে অভিযান চালিয়েছে বন বিভাগ। গত ১৬ এপ্রিল চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের উচিতারবিল এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে ৯টি নতুন বসতি উচ্ছেদ করা হয়। এখান থেকে তিন একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়। গত ১৩ এপ্রিল কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে গাছ কাটার সময় ২৬ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে বন বিভাগ।
জাতিসংঘের মতে, সারা বিশ্বে ১.৬ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে বনের ওপর নির্ভর করছে। প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বিশ্বের ৮০ শতাংশ বন মানুষের কারণে ধ্বংস হয়েছে। এফএওর তথ্য অনুযায়ী বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জ্বালানি কাঠের বার্ষিক অর্থমূল্য চার লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি। বনের ওপর মানুষ নানাভাবে নির্ভরশীল। বন অক্সিজেন তৈরি করে। কার্বন ডাই-অক্সাইড সংরক্ষণ করে। বাতাস পরিষ্কার ও ভূমিক্ষয় রোধ করে। বন বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বাতাসকে নির্মল রাখে। পৃথিবীর প্রায় ৩০ কোটি লোক বাস করে বনে। তাদের মধ্যে ছয় কোটি লোকই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।
জীবজগতের ৮০ শতাংশের বসবাস বনে। প্রায় ৬০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদের আবাসস্থল এই বন। এ ছাড়া উভচর প্রজাতির ৮০ শতাংশ, পাখি প্রজাতির ৭৫ শতাংশ এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রজাতির ৬৮ শতাংশের বসবাস বনে। কিন্তু ধীরে ধীরে উজাড় হয়ে যাচ্ছে এসব বন। এফএওর মতে, বিশ্বব্যাপী ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল নাগাদ প্রায় ১.৪ শতাংশ বন হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশে বেশির ভাগ বন ধ্বংস হচ্ছে দখলের মাধ্যমে। বন বিভাগের তথ্য মতে, সারা দেশে দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বন দখলে চলে গেছে। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গড়ে ২৫ হাজার একর বনভূমি দখল হয়েছে। এসব বন ধ্বংসের কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী। এ ব্যাপারে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর নেচার কনজারভেশনের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ৩১। এক হাজার ৬০০ প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টি হুমকির মধ্যে রয়েছে। আইইউসিএনের ২০০০ ও ২০১৫ সালের প্রতিবেদন তুলনা করলে দেখা যাবে এই বিলুপ্তির হার অত্যধিক। ২০০০ সালে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ছিল ১৩। অর্থাৎ ১৫ বছরে ১৮টি প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা ভয়াবহ বিলুপ্তির হারকে নির্দেশ করছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জীববৈচিত্র্য
- সংরক্ষিত বনভূমি