হামে শিশুমৃত্যু ও শূন্যের ফেরিওয়ালা
গত এক মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ৩০০ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শত শত শিশুর শবযাত্রা দেখে একজন মানুষের কথাই মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন কথার জাদুকর। কত কথা বলেছেন। কত আশা জুগিয়েছেন। শুধু জুগিয়েছেন—পালন করেননি একটিও। যেমন মেঘ ভেসে আসে বৃষ্টির প্রতিশ্রুতি নিয়ে, তারপর বিনা বৃষ্টিতে শুকিয়ে যায় বাতাসে, তেমনি তাঁর বাণী এসে লেগেছিল আমাদের চোখে-মুখে, কানে-মগজে। কিন্তু দিন শেষে আমরা বুঝেছি, শূন্যতাই রয়ে যায় শুধু। বাকি সব ফাঁকি। মায়া। কথার মায়া। ভোরের স্বপ্ন যার মধ্যাহ্ন পর্যন্ত টেকেনি।
একদা এক জ্ঞানী বলেছিলেন— ‘স্বপ্ন দেখতে নেই, স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করতে হয়।’ কিন্তু বাংলাদেশ বড়ই ভাগ্যবান—এখানে স্বপ্ন দেখাই এক ধরনের কর্মসূচি। কাজ নেই, ওয়ার্কশপ আছে। চাকরি নেই, সেমিনার আছে। উন্নয়ন নেই, উন্নয়নের পরিকল্পনার পরিকল্পনার পরিকল্পনা আছে। আর সেই কর্মসূচির প্রধান পরিকল্পনাকারী, সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, সেই কথার জাদুকর—আমাদের প্রিয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস। থ্রি জিরো তত্ত্বের মহাগুরু, নোবেলজয়ী সম্রাট, যাঁর হাতের ছোঁয়ায় সমস্যা অদৃশ্য হয়ে যায় শুধু বাক্যবাণে। কথা বললেই যেন মিলিয়ে যায় দারিদ্র্য, উধাও হয় বেকারত্ব, অবলুপ্ত হয় কার্বন। কী চমৎকার এক কাণ্ড!
শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন নিঃসরণ—শুনতে এমন যে, মনে হয় জাতিসংঘের কনফারেন্স রুমে বসে পৃথিবীটাই নতুন করে ডিজাইন হয়ে যাচ্ছে। অক্সফোর্ডের গম্ভীর সেমিনার হল থেকে হার্ভার্ডের ক্যাম্পাস, এক্সেটার থেকে সোরবোন, সব জায়গায় একই সুর—সামাজিক ব্যবসা, মানবতার অর্থনীতি, তিন শূন্যের সোনালি ভবিষ্যৎ। বক্তৃতা শুনে শ্রোতারা এমনভাবে মাথা নাড়েন, যেন পরের দিন থেকেই পৃথিবী ইউটোপিয়া হয়ে যাবে। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে তাঁদের টুপি ওড়ার জোগাড়।
প্রশ্ন হলো, এই শূন্যগুলো কি বাস্তবের মাটিতে দাঁড়াতে পেরেছে, নাকি শূন্যের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে? বাস্তবের লেন্স দিয়ে দেখলে ছবিটা একটু অন্যরকম। এই থ্রি জিরো আসলে তিনটি দার্শনিক বুদবুদ— ছুঁলেই ফুসস। আর সেই বুদবুদের ভেতর খুঁজে পাওয়া যায় বাংলাদেশের জনগণের করুণ পরিণতি।
প্রথম কথা হলো, দারিদ্র্যহীনতার জিরো। ইউনূসের ক্যানভাসে দারিদ্র্য যেন মায়াবী জাদুতে মুছে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে কী পেলাম? দারিদ্র্য যায়নি, বরং ‘দারিদ্র্য নিয়ে আলোচনা’ বেড়েছে। গরিব মানুষ এখনও গরিব, তবে এখন তারা অন্তত জানে যে তারা ‘সোশ্যাল বিজনেস মডেলের অংশগ্রহণকারী’। আগে ক্ষুধার্ত ছিল, এখন ক্ষুধার্ত প্লাস কনসেপ্টুয়ালি আপগ্রেডেড। মানবতার বাণী এসে ঠেকেছে এখানেই।
দ্বিতীয় জিরো—বেকারত্বহীনতা। আকাশ থেকে মুড়ি পড়ার মতো অলৌকিক এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা কী? কাজ নেই, তবে ওয়ার্কশপ আছে। চাকরি নেই, কিন্তু সেমিনার আছে। যুবকরা এখন আর বেকার নয়—তারা ‘সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ’ অথবা ‘স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের অংশ’। বেকারত্বকে শব্দ দিয়ে মেরে ফেলা—এ এক নতুন অর্থনৈতিক আবিষ্কার, যার পেটেন্ট নেওয়া উচিত।
তৃতীয় জিরো—কার্বন নিঃসরণ শূন্য। বাংলাদেশের উন্নয়নশীল শহরগুলোতে কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির কালো কুয়াশা। অথচ এই তত্ত্বের জাদুতে কার্বন তো কমেনি, বরং কথার ধোঁয়া এত বেড়েছে যে আসল ধোঁয়াই চোখে পড়ে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশুর মৃত্যু
- হাম রোগ