ভারতের বাংলাদেশ নীতি : পুনর্মূল্যায়নের সময়

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, যা গড়ে উঠেছে ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তানির্ভর পারস্পরিকতার ভিত্তিতে। ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত শুধু একটি ভৌগোলিক রেখা নয়; এটি বাণিজ্য, সংস্কৃতি, যোগাযোগ এবং কৌশলগত সম্পর্কের একটি সেতুবন্ধ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা-সব মিলিয়ে এ সম্পর্ককে প্রায়শই একটি স্বাভাবিক অংশীদারত্ব হিসাবে দেখা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু, পারস্পরিক সন্দেহ এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এ সম্পর্ককে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য তার বাংলাদেশনীতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। এ সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সামরিক, কূটনৈতিক ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রথম স্বীকৃতিদাতা দেশ হিসাবে আবির্ভূত হয়। এই প্রাথমিক সহযোগিতা দুই দেশের মধ্যে একটি গভীর আবেগঘন সম্পর্ক তৈরি করে। পরবর্তী দশকগুলোয় বাণিজ্য, সংস্কৃতি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মিল দুই দেশের জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।


নিরাপত্তা সহযোগিতা দীর্ঘদিন ধরে এ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। উভয় দেশ সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসবাদ, চোরাচালান, বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করেছে। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও বেড়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে। যোগাযোগ অবকাঠামো-সড়ক, রেল, নৌপথ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ-এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে এ ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। সীমান্তে সহিংসতা তার মধ্যে অন্যতম। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনার ফলে অনেকের মনে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নয়, বরং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে। এ ধারণা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।


তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সমস্যা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি দুই দেশের মধ্যে একটি সফল সহযোগিতার উদাহরণ হলেও তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি শুধু পানির প্রশ্ন নয়; এটি আস্থা ও প্রতিশ্রুতির বিষয়। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা-বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তি-এ চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করলেও বাংলাদেশের জনগণের কাছে এটি একটি অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি হিসাবে বিবেচিত হয়। ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়েও বাংলাদেশে উদ্বেগ রয়েছে।


এদিকে, চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এ সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি প্রকল্প এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন বাংলাদেশে তার প্রভাব বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বহুমুখী কৌশলের অংশ-যেখানে সে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থ সর্বোচ্চভাবে নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু ভারতের কাছে এটি একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশকে কি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসাবে দেখা হবে, নাকি অংশীদার হিসাবে? বাংলাদেশ কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ময়দান নয়; এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, যার নিজস্ব স্বার্থ ও অগ্রাধিকার রয়েছে। তাই ভারত যদি তার অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়, তবে তাকে চাপ সৃষ্টি নয়, বরং আস্থা ও সহযোগিতার মাধ্যমে এগোতে হবে। এ বাস্তবতায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে পুনঃসমন্বয় জরুরি।


প্রথমত, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন-এটি শুধু কূটনৈতিক ভাষা নয়, বরং সম্পর্কের ভিত্তিগত পুনর্গঠনের প্রশ্ন। বাংলাদেশকে একটি ছোট বা নির্ভরশীল দেশ হিসাবে দেখার মানসিকতা যদি থেকে যায়, তবে সম্পর্ক কখনোই সত্যিকারের ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে না। আজকের বাংলাদেশ দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি-জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতার ক্ষেত্রে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে এর ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভারতের জন্য জরুরি হলো বাংলাদেশকে একটি সমান মর্যাদাসম্পন্ন অংশীদার হিসাবে দেখা, যেখানে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং যৌথ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটলে সম্পর্কের ভেতরে যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব রয়েছে, তা অনেকাংশে কমে আসবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও