সাতচল্লিশের ইতিহাস ফিরে এলো পশ্চিমবঙ্গে

যুগান্তর সৌমিত্র দস্তিদার প্রকাশিত: ০৬ মে ২০২৬, ০৮:৫৯

যে কোনো নির্বাচন নিয়েই ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রাথমিকভাবে যা হয় তাতে যুক্তির চেয়ে আবেগ থাকে বেশি। এই যে এখন পশ্চিমবঙ্গের ভোটে মমতা ব্যানার্জির চূড়ান্ত ভরাডুবির পর যে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে, তাতে মোটামুটি একটা কথাই সামনে আসছে : গত ১৫ বছরের রাজত্বকালে মমতার দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে জনগণ রায় দিয়েছেন। কথাটা কোনোভাবেই আপনি উড়িয়ে দিতে পারবেন না। হেন কোনো দুর্নীতি নেই যা তৃণমূল সরকার করেনি। শিক্ষাক্ষেত্র লাটে তুলে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিসেবা তথৈবচ। টাকা ছাড়া কোনো কাজ তৃণমূল জমানায় অসম্ভব ছিল। সেই সঙ্গে ছিল সীমাহীন ঔদ্ধত্য। ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাধিটি খোদ মমতা ব্যানার্জিকে পেয়ে বসেছিল। তিনি জেতার পরপরই এক সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তাকে বিনয়ের সঙ্গে কিছু কথা বলতে গিয়ে বিনা কারণে সাসপেন্ড হয়েছিলেন। এক টিভি টকশোতে মৃদু প্রশ্ন তোলায় প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রী তানিয়া ভরদ্বাজকে তিনি ‘মাওবাদী’ বলে হইচই বাধিয়ে দিয়েছিলেন। সামান্য কার্টুন পোস্ট করার ‘অপরাধে’ অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্রকে জেলে পোরা হয়েছিল। এরকম অজস্র মমতা কাহিনি বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।


বাংলাদেশের মানুষের বড় ধারণা, তিনি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলিম অন্তঃপ্রাণ। এটা ঠিকই যে, মমতা ব্যানার্জির রাজত্বে এ রাজ্যে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে মুসলিম মিডল ক্লাসের ছবি নিশ্চিত আগের থেকে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। অধ্যাপক, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু তার পেছনে সরকারি উদ্যোগ নিতান্তই নামমাত্র। সরকারি চাকরি ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে এগোতেই হবে, তাই রোখ নিয়ে মুসলিম সমাজের বেশ কয়েকজনের উদ্যোগে মধ্যবিত্ত মুসলিম গড়ে উঠেছে। কাজের চেয়ে ঢাক পিটিয়ে মুসলিম সমাজের মসিহ সাজা ছিল মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক কৌশল। ঠিক যেমন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের আমলেই সবচেয়ে বেশি হিন্দু সম্পত্তি লুট হলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় অংশ ছিল শেখ হাসিনার ভোটব্যাংক। হাসিনার চোরকে চুরি করার আর গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলার যে রাজনৈতিক কৌশল, ঠিক একই রকম তথাকথিত মুসলিম ‘তোষণ’ ছিল মমতা ব্যানার্জির রণনীতি। তার সঙ্গে মুসলমান প্রীতির আদৌ সম্পর্ক ছিল না। রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণে এ রাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো ভূমিকাই ছিল না। মসিহ হতে গিয়ে মমতা চাইতেন, ওয়াক্ফ থেকে এসআইআর-সব বিষয়ে একমাত্র তিনি যা বলবেন, করবেন-সেটাই চূড়ান্ত। সমাজের অন্য কারও কথা বলা, আন্দোলন করা চলবে না। মুসলিম সমাজের মধ্যে মমতা কিছু মাফিয়া তৈরি করেছিলেন, যাদের দিয়ে ভয়ের আবহ তৈরি করে মুসলিম ভোটব্যাংকের পাহারাদার বানিয়েছিলেন। এরা একেকজন ছিলেন কম্যুনিটির সর্দার টাইপ। মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ কখনো বেচাল কথা বললেই মমতা ধমকে তাদের শুধু চুপ করিয়েই দিতেন না, পুলিশ পাঠিয়ে শায়েস্তা করতেন। যখন তখন নোংরা ভাষায় অপমান করে দুধেল গাই বলতেও দ্বিধা করতেন না। তিনি এমন ‘সহৃদয়’ ছিলেন যে, স্বাধীনতা-পরবর্তী এ বঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের জীবনগাথা নিয়ে তৈরি আমার ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘মুসলমানের কথা’ বাসায় পুলিশ পাঠিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।


তার এই মুসলিমবান্ধব ভাবমূর্তি নির্মাণের পেছনে ছিল আরও বড় এক নীল নকশা, যা চমৎকারভাবে ব্যবহার করতে আজ বিজেপি ভুল করেনি। কবর ও মসজিদ রং করা ছাড়া মুসলমান সমাজের উন্নয়নে খুব বেশি কিছু ভূমিকা না নিয়েও তিনি নিঃশব্দে ধীরে ধীরে যত্রতত্র ইনশাআল্লাহ, মাশাল্লাহ বলে বলে বৃহত্তর হিন্দু সমাজের কাছে বার্তা দিলেন, তিনি মুসলিম জনগোষ্ঠীর রক্ষক। ফলে সমাজটা ধীরে ধীরে মেরুকরণের চেহারা নিল। হিন্দু ভোট সংহত হলো। মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে গেল তৃণমূল, সিপিআইএম, আইএসএফ ও হুমায়ুন কবিরের দলের মধ্যে; এবার ভোটে বিজেপির সাফল্য গতবারের চেয়ে সাত শতাংশ ভোট স্যুইং করায়।


মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক। তবে নিঃসন্দেহে তিনি ওয়েলফেয়ার ইকোনমি চালু করে দরিদ্র নারীদের অনেকেরই সমর্থন পেয়েছিলেন। ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান না গড়লেও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে তিনি নিশ্চিত অক্সিজেন দিয়েছিলেন। বাম আমলে লাটে ওঠা তাঁতের প্রতিষ্ঠান তন্তুজ ও মন্জুষাকে লাভের মুখ দেখিয়েছিলেন। মমতার আমলে গোটা রাজ্যে কম্যুনিটি ট্যুরিজমের বিপুল বিস্তার ঘটেছে। হোম স্টে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ঠিক দল ছিল না। বরং বলা ভালো, এক ধরনের মঞ্চ বা প্ল্যাটফর্ম ছিল। সেখানে জড়ো হয়েছিল ভিন্ন ধারা, ভিন্ন মতাদর্শের অজস্র লোক। নকশালপন্থি থেকে চরম দক্ষিণপন্থি বিচিত্র সমাহার। ব্যক্তিগতভাবে মমতা নিজে নিশ্চিত ছিলেন চরম দক্ষিণপন্থি। বিজেপি ও মমতা ব্যানার্জির এই এক বিষয়ে গভীর মিল। দুই পক্ষই উগ্র কমিউনিস্ট বিদ্বেষী। দুই সংগঠনের আরও মিল আছে। কেউই বিন্দুমাত্র গণতন্ত্র পছন্দ করেন না। গণতন্ত্রের পরিসর বিলুপ্ত করলে যে পরিণতি কী হতে পারে, আজ নিশ্চিত দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনা, কলকাতায় মমতা ব্যানার্জি বুঝছেন। আজ যারা পশ্চিমবঙ্গের মসনদের দখল নিলেন, আগামী দিনে তারাও ঠিকই বুঝবেন। সমস্যা হচ্ছে, সব দলই-সব দেশেই-সাধারণভাবে ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়’ আপ্তবাক্যটি ক্ষমতা পেয়ে বড় তাড়াতাড়ি ভুলে যায়।


তবে আমি তাদের সঙ্গে মোটেও এক মত নই, যারা মমতা ব্যানার্জির পরাজয়কে নিছক জনাদেশ বলে প্রচার করে চলেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের হাজারো অন্যায়, ত্রুটি আছে। যার ফলে মানুষের বড় অংশ মমতার পাশ থেকে সরে গেছেন। কিন্তু এবার তাকে সরতেই হতো। বাংলাদেশের মানুষ জানেন কিভাবে শেখ হাসিনা ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ভোটে জিতেছিলেন। ছোট মুখে বড় কথা বলা ঠিক নয়, তবুও যারা আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি পড়েন, তারা নিশ্চিত সায় দেবেন চূড়ান্ত ভোটের, ২৯ এপ্রিলেও বলেছিলাম, বিজেপি ক্ষমতায় আসতে চলেছে। এবার ভোটের কী ফল হতে চলেছে, তা সেদিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, যেদিন ভোটার তালিকা থেকে ২৭ লাখ লোকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। বাদ দেওয়া, বিপর্যস্ত মনিপুরের থেকে অন্তত নয়গুণ কেন্দ্রীয় বাহিনী বঙ্গের মাটিতে রুট মার্চ করা, উত্তর প্রদেশের এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট পুলিশ অফিসার নিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা-সব দৃশ্য পরপর সাজালেই বিরাট এক নীলনকশা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অস্ত্র হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি বাবু ভদ্রলোক মননে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ চারিয়ে দেওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। সবই ওই নকশা নির্মাণের প্রস্তুতি। ১৯৪৭ সালের ইতিহাস নতুনভাবে ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এলো।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও