এত সংগ্রামেও মুক্তি কেন এলো না

কালের কণ্ঠ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রকাশিত: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫১

আমাদের সমষ্টিগত মানুষের মুক্তি আসেনি কেন? মুক্তি আসেনি এই কারণে, ওই যে পুঁজিবাদী ধারা—যেটি ব্রিটিশ আমলে ছিল, পাকিস্তান আমলে ছিল, আজকেও আছে; সেই পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারাই অক্ষুণ্ন রয়েছে। আমরা ব্রিটিশ আমলে তিন ধারার শিক্ষা দেখেছিলাম। পাকিস্তান আমলে সেটি আরো বড় হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে তিন ধারার শিক্ষা থাকবে না, সব শিক্ষা মাতৃভাষার মাধ্যমে হবে, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গভীর হবে, স্থায়ীভাবে এবং প্রকৃত শিক্ষা হবে—এটি ছিল আমাদের স্বপ্ন, এটি ছিল আমাদের চ্যালেঞ্জ।


কিন্তু কোথায় সেই স্বপ্ন, কোথায় সেই চ্যালেঞ্জ? এখন তো তিন ধারার শিক্ষা কেবল যে আছে তা নয়, এই শিক্ষা আরো বিস্তৃত, আরো গভীর হয়েছে। এর কারণ শ্রেণিবিভাজন আরো বড় হয়েছে। শ্রেণিবিভাজন আরো গভীরে চলে যাচ্ছে। কাজেই তিন ধারাকে এক ধারায় আনা সেটি একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।


এই যে আমাদের দেশ বাংলাদেশ, এর এত যে সম্পদ; এই সম্পদের জন্য বিদেশিরা এখানে এসেছে। বাংলাদেশের নগর-বন্দর তারা ব্যবহার করেছে, আমাদের পণ্য আমরা রপ্তানি করেছি। এই বাংলাদেশ এত দরিদ্র  হলো কেন? দরিদ্র হলো এই কারণে যে এখানে উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছিল। এখানকার সম্পদ একসময় দিল্লিতে যেত, পরে এই সম্পদ লন্ডনে চলে যাওয়া শুরু করল।


পাকিস্তান আমলে দেখলাম, সম্পদ করাচিতে চলে যাচ্ছে। এসবই ছিল একটি ঔপনিবেশিক শোষণপ্রক্রিয়া, যেখানে বাংলাদেশ হচ্ছে একটি উপনিবেশ। পাকিস্তানিরা যে অভ্যন্তরীণ একটি উপনিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছিল, ওই ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হয়নি আজকের বাংলাদেশ। তাকালেই দেখা যাবে এই বাংলাদেশ এখন ধনীদের, বিত্তবানদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। ঔপনিবেশিকরা যেমন এখান থেকে লুণ্ঠন করত, শোষণ করত এবং সেই সম্পদ পাচার করত, আজকের বাংলাদেশে সেই একই ঘটনা ঘটছে; ধনীরা এখানকার সম্পদ লুণ্ঠন করছে এবং শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে যে অর্জিত সম্পদ, এটি বিদেশে চলে যাচ্ছে।


অর্থাৎ ওই ঔপনিবেশিকতা আছে, ওই পুঁজিবাদী উন্নয়ন আছে; সেখান থেকে আমরা মুক্তি পাইনি। আমাদের একাত্তরে স্বপ্ন ছিল এই যে আমরা মুক্ত হব, আমরা তার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি, কিন্তু মুক্তি এলো না। আগের ব্যবস্থাই রয়ে গেল, আগের রাষ্ট্রই রয়ে গেল, আগের আইন, আগের কানুন, আগের বাহিনী, আগের শিক্ষাব্যবস্থা—সবকিছু রয়ে গেল। কেন রয়ে গেল? রয়ে গেল এই কারণে যে শাসনক্ষমতা পুঁজিবাদীদের হাতে চলে গেল। ব্রিটিশের পুঁজিবাদী শোষণ-শাসন আগেই ছিল, পাকিস্তানি পুঁজিবাদ সেখানে এলো। স্বাধীন বাংলাদেশে তার জায়গায় এলো বাঙালি পুঁজিবাদ, বাঙালি বুর্জোয়া। সে জন্য যে জিনিসটি আমাদের জানতে হবে, সেটি হলো ব্যক্তিগত উন্নয়নে চলবে না। কেবল শুধু গাড়িঘোড়ার স্বপ্ন দেখা, চড়ার স্বপ্ন দেখে শিক্ষা করা না। আমাদের এই সমাজকে বদলাতে হবে। এই সমস্যা কেবল আমাদের নয়, আজকে সারা পৃথিবীর সমস্যা হচ্ছে সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানার সমস্যা এবং ব্যক্তিমালিকানার বিপরীত যে ধারা, সেটি হচ্ছে সামাজিক মালিকানা।


হ্যাঁ, সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল। বিপ্লব হয়েছিল ১৯১৭ সালে রাশিয়ায়, বিপ্লব হয়েছে চীনে, বিপ্লব হয়েছে অন্য দেশে, পূর্ব ইউরোপে, কিউবায়। কিন্তু ওই যে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা, সেটি সেখানে টিকল না। টিকল না কেন? টিকল না এই জন্য যে কোনো এক জায়গায় বা কোনো এক দেশে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করলে আপনি সেটিকে রক্ষা করতে পারবেন না। কারণ বাইরের শত্রু তৎপর রয়েছে। পুঁজিবাদী শত্রু তাকে আক্রমণ করবে, দুর্বল করে দেবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলো এ জন্য যে সারা বিশ্বের চারদিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ছিল। তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে ব্যস্ত রাখল আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধাস্ত্র উদ্ভাবনে। শিল্পের বিকাশ, উৎপাদনের বিকাশ—সেদিকে ব্যস্ত না রেখে ব্যস্ত রাখল মারণাস্ত্র উদ্ভাবনে। অথচ সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের পরে অপরাধ বলে কোনো কিছু ছিল না, সেখানে বাসস্থানের কোনো সমস্যা ছিল না, বেকারত্বের সমস্যা ছিল না।


আজকের দিনে পৃথিবী থাকবে কি থাকবে না, তা মনুষ্য উপযোগী হবে কি হবে না, সেটি নির্ভর করছে মালিকানা কাদের কাছে থাকবে তার ওপর। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খুব উপকার দেবে, অসম্ভব কাজ করবে। চিকিৎসাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে এরই মধ্যে। কিন্তু বিপদ হবে এই যে এর মালিকানা থাকবে অল্প কিছু লোকের হাতে এবং সেই মালিকরা একে ব্যবহার করবেন তাঁদের স্বার্থে, মুনাফার স্বার্থে এবং তাঁরা হয়তো অন্য গ্রহে চলে যাবেন। সে কথা উঠছে। এখনই ভাবছেন যে মঙ্গল গ্রহে গিয়ে তাঁরা আবাসন গড়ে তুলবেন। কিন্তু এই পৃথিবীতে বৈষম্য বাড়বে এবং বহু মানুষ বেকার হবে এবং যারা কাজ করবে, তারাও অলস হবে। কারণ তাদের সৃষ্টিশীলতার দরকার হবে না। সৃষ্টি যা কিছু করার যন্ত্রই করে ফেলবে। যন্ত্রই হয়তো কবিতা লিখবে, যন্ত্রই হয়তো গান শেখাবে। মানুষ তখন কী করবে?


মানুষ হয়তো গৃহপালিত পশুপাখির মতো থাকবে; যন্ত্রের গৃহে। যন্ত্র হয়তো মালিক হলো। যন্ত্রের মালিকানা হয়তো প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা কি সাধু? যান্ত্রিক হব? তা নয়, যন্ত্রের অধীনে চলে যাব। এই সমস্যাটি পৃথিবীর সমস্যা এবং এই সমস্যা পুঁজিবাদ তৈরি করছে উন্নয়নের নামে। কাজেই এই উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের ভাবতে হবে যে আমরা কেবল ব্যক্তির উন্নয়ন চাইব না, আমরা সমষ্টির উন্নয়ন চাইব। সমষ্টির উন্নয়নের জন্য সমাজের পরিবর্তন আনতে চাইব। যাকে বলি সামাজিক বিপ্লব, সেটি প্রয়োজন হবে। সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেখানে এই তরুণদের, যারা তরুণ শিক্ষার্থী, তাদের যে ভূমিকা, সেটি হতে পারে দুঃসাহসী। সেটি অত্যন্ত কার্যকর হবে। কেননা তাদের স্বপ্ন আছে, সামর্থ্য আছে, সাহস আছে এবং সে জন্য জ্ঞানচর্চা করতে হবে। কিন্তু ওই যে বললাম, জ্ঞানকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে পৃথিবীকে বদল করার জন্য। পৃথিবীকে কেবল বুঝলে হবে না, পৃথিবীকে বদল করা চাই। তাই জ্ঞান দিয়ে পৃথিবীকে বদল করতে হবে এবং শুধু নিজের বিষয়ে পড়লে হবে না, বিশেষভাবে পড়তে হবে সাহিত্য ও ইতিহাস। সাহিত্য না পড়লে মনুষ্যত্ব বিকশিত হবে না এবং ইতিহাস না পড়লে আমরা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যেক বুঝতে পারব না। সে জন্য ইতিহাসের জ্ঞান, সাহিত্যের জ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও