দাম বাড়ল জ্বালানির, চাপ বাড়ল জীবনে

www.ajkerpatrika.com শোয়েব সাম্য সিদ্দিক প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৯

১৮ এপ্রিল মধ্যরাতে অনেকেই ঘুমিয়ে ছিলেন। সেই সময়েই এমন একটি সিদ্ধান্ত হলো, যার প্রভাব সকাল থেকেই প্রতিটি পরিবারের খরচে পড়েছে। লিটারপ্রতি কয়েক টাকা বাড়তি অঙ্ক কাগজে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এর ওজন অনেক বেশি। ভোরে সেচপাম্প চালানো কৃষক, বাসে চড়ে কাজে যাওয়া শ্রমিক, কেরোসিনের আলোয় সন্তানের পড়া দেখা মা, সবার জন্যই এই বাড়তি খরচ আলাদা করে ধরা দেয়। এই দাম বাড়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা একটি কাঠামোগত সংকটেরই প্রকাশ।


একটি দেশের অর্থনীতি কতটা মজবুত, তা বোঝার জন্য শুধু জিডিপির সংখ্যা যথেষ্ট নয়। দেখতে হয় কারখানা চালাতে, ঘরে আলো দিতে, কৃষি ধরে রাখতে সেই দেশ কতটা নিজের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটা স্পষ্ট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৬৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যা ভিত্তির দুর্বলতাই দেখায়।


এই নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫-এর মধ্যে এটি বেড়েছে ৬৩ শতাংশ, যেখানে একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেও বিদেশের ওপর নির্ভরতা আরও দ্রুত বেড়েছে। এটি অগ্রগতির চেয়ে ঝুঁকির ইঙ্গিতই বেশি।

এই নির্ভরতার দাম দিচ্ছে সাধারণ মানুষ আর শিল্প খাত। তেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিটে ১৮ থেকে ২০ টাকা, কয়লায় প্রায় ৭ টাকা, আর গ্যাসে মাত্র ৩ টাকা। তবু আমরা ব্যয়বহুল তেলনির্ভর উৎপাদনের দিকেই ঝুঁকছি। কারণ, গ্যাসের সরবরাহ কমছে, বিকল্পও তৈরি হয়নি। ফলে খরচ বাড়ছে, আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত বাজারে গিয়ে পড়ছে।


দাম বাড়ার প্রভাবও সরাসরি ছড়িয়ে পড়ে। ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়লে সেচ খরচ বাড়ে, পরিবহনভাড়া বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। অকটেন ও পেট্রলের দাম ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ায় যাতায়াত খরচ বেড়ে যায়। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। শহরের মানুষ যেমন টের পান, গ্রামের মানুষের ওপর তার চাপ আরও বেশি পড়ে। কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়া মানে অনেক পরিবারের রাতের আলো আরও ব্যয়বহুল হয়ে যাওয়া।


তাহলে কি শুধু দাম বাড়াই একমাত্র সমস্যা? না, সমস্যা আরও গভীরে। দামটা যেন একটা উপসর্গ মাত্র, আসল অসুখ লুকিয়ে আছে কাঠামোয়। বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি চাহিদা প্রায় ৭২ লাখ টন, যার ৯২ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এই বিশাল আমদানি বোঝা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করছে। টাকার মান কমে যাওয়ায় ২০২৪ সালে শুধু অপরিশোধিত তেল আমদানিতেই আগের বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ ডলার খরচ হয়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় মানে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমছে, আমদানি দায় বাড়ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হচ্ছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে। বাংলাদেশ বার্ষিক প্রায় ১৪ লাখ টন অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আনে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। এই প্রণালিতে সংকট তীব্র হওয়ায় কাতার, যে দেশ থেকে বাংলাদেশের ৭৫ শতাংশ এলএনজি আসে, তারা উৎপাদন ও চালান স্থগিত করেছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাসের অভাবে অলস পড়ে থাকছে এবং লোডশেডিং বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানি বিল আরও ৪.৮ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি।


এখানে স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লে সংকট কেন? সমস্যাটা ক্ষমতায় নয়, জ্বালানিতে। গ্যাসের দাম শিল্পে প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ থেকে ৪২ টাকায় উঠেছে, সরবরাহও কমেছে। ফলে টেক্সটাইল, গ্লাস, সিরামিক ও ইস্পাত খাত সরাসরি চাপের মুখে। কারখানা পুরো ক্ষমতায় চলছে না, রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ হচ্ছে না, শ্রমিকদের কাজের সময়ও কমছে। এই ক্ষতি হিসাবের খাতায় স্পষ্ট না হলেও অর্থনীতিতে জমে থাকে।


কৃষিতেও একই চিত্র। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ খরচ বাড়ে, তার সঙ্গে বাড়ে উৎপাদন ব্যয়। এতে কৃষক চাপে পড়েন, আর খাদ্যের দামও বাড়ে। এই ধারা শুরু হলে কোথায় গিয়ে থামে, তা বলা কঠিন। বোরো মৌসুমের শেষ দিকে এই মূল্যবৃদ্ধি সেচের বাড়তি খরচ সরাসরি ধানের উৎপাদন ব্যয়ে যুক্ত হচ্ছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও