সংসদে স্তুতির একাল-সেকাল

বিডি নিউজ ২৪ আমীন আল রশীদ প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:০২

এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালে যখন অষ্টম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে যুক্ত করা হয়, তখন এই বিলের বিরুদ্ধে সংসদে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলেন নুরুল ইসলাম মনি। তিনি তখন বরগুনা-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য।


ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উপলক্ষ্য’ মন্তব্য করে নুরুল ইসলাম মনি তখন সংসদে বলেছিলেন, ‘আজকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে ৯৫ শতাংশ লোক মুসলমান, যারা ইসলামকে বিশ্বাস করে এবং যেখানে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল ইসলামের ভিত্তিতে, সেই পাকিস্তানের আমলেই আমরা দেখেছি ইসলামের ভড়াডুবি। ইসলামের নামকরণ করতে গিয়ে যে অনৈসলামিক কাজ-কর্ম হয়েছে পাকিস্তানের সময়, তা আমরা দীর্ঘদিন অবলোকন করে এসেছি। তার পরিণতিতে আজকের এই বাংলাদেশের জন্ম। এ দেশের সাধারণ মানুষ খুব ভালো করে জানে যে, ঘুষ না দিলে বাংলাদেশে কোনো কাজ হয় না। এই ঘুষ কারা খায়? ভদ্রলোকেরাই ঘুষ খেয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে যায়। আজকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা হলে, আজকে যে ভদ্রলোক মসজিদে নামাজ পড়তে যান না বা রোজা রাখেন না, তিনি কি নতুন করে রোজা রাখবেন এবং নামাজ পড়বেন? রাতারাতি কি তারা ফেরেস্তা হয়ে যাবেন?’ (জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী ১৯৮৮, পৃ. ১৬২২)।


সেই নুরুল ইসলাম এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ। গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। টাইম ম্যাগাজিন পত্রিকায় বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তিত্বের মধ্যে তারেক রহমানের নাম আসায় তাকে সংসদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানান চিফ হুইপ। এ সময় তিনি একটি কবিতা পাঠ করেন। তবে কবিতাটি কার লেখা, তা তিনি উল্লেখ করেননি।


কবিতাটি এরকম:


‘তিনি আসার আগে দেশটা যেন ভাঁজ করা মানচিত্র ছিল,


নদী ছিল, মানুষ ছিল, স্বপ্নও ছিল


কিন্তু দিগন্ত খুলে দেওয়ার মতো কোনো হাত ছিল না।


তিনি এলেন, বললেন, খুবই কম কথা, সময়ের কপালে লিখে দিলেন একটি উজ্জ্বল উচ্চারণ


বললেন, উই হ্যাভ আ প্ল্যান


তাঁর দৃঢ়তা ছিল পাহাড়ের মতো


কিন্তু হৃদয় শিশিরভেজা ঘাসের মতো


বিশ্বের বড় বড় দরজায় তিনি কড়া নাড়েননি, নিজের আলোয় দাঁড়িয়েছিলেন, দরজাগুলো নিজেই খুলে গেছে


এখন দূরদেশের আকাশেও আমাদের পতাকার রং দেখা যায়,


বিদেশি বাতাসেও শোনা যায় এই মাটির নাম


এই দেশের নাম, বাংলাদেশের নাম


নেতৃত্ব মানে শুধু সামনে হাঁটা নয়,


নেতৃত্ব মানে অসংখ্য ক্লান্ত মানুষের চোখে স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা


আশা জাগিয়ে তোলা।’


কবিতাটি কার লেখা তিনি যেহেতু উল্লেখ করেননি, ফলে অনেকে ধারণা করছেন এটি চিফ হুইপ নিজেই লিখেছেন।


এর আগে গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদ শুরুর প্রথম দিনেই সংসদের বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদের কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।


খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সংসদে কবিতা পাঠের এই ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে সংগীতশিল্পী ও সংসদ সদস্য মমতাজের গানের কথা। শুধু মমতাজ নন, ওই সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে স্তুতি মোটামুটি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অতি উৎসাহী কেউ কেউ শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সঙ্গে ‘রহতামুল্লাহি আলাইহি’ উচ্চারণ করতেন।


নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) ওলি-আউলিয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন।’ আবার শেখ হাসিনার শাড়ির প্রশংসা নিয়েও সংসদের হাসির রোল পড়েছে। শেখ হাসিনা নিজেও এইসব প্রশংসা ও স্তুতি উপভোগ করতেন বলেই মনে হয়।


কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।


পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে ২০২২ সালের ২৭ জুন সংসদে গান ও কবিতার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন মমতাজ এবং সাবেক সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর।


মমতাজ প্রথমে গান শোনান— ‘আমার নেত্রী শেখ হাসিনা যার তুলনা নাই/ এমন একজন নেত্রীর জন্য আমি দোয়া চাই।’


একপর্যায়ে মমতাজ বলেন, ‘এখন নারীরা শাড়ি-গয়না চায় না।’ এরপর তিনি গেয়ে ওঠেন:


‘চাই না গয়না চাই না শাড়ি/ নৌকাতে ভোট না দিলে যাবো চলে বাপের বাড়ি।’


বক্তব্যের শেষের দিকে বিরোধী দলের দিক থেকে মমতাজকে আরও একটি গান গাওয়ার অনুরোধ আসে। মমতাজ তখন বলেন, ‘আরে আপনি শুনতে চেয়েছেন, গাইবো না?’


এরপর তিনি গেয়ে ওঠেন, ‘সবার আগে চিন্তা করলো শেখ হাসিনার সরকার/ যাতায়াতের উন্নয়নে পদ্মা সেতু দরকার।’


এর আগে তৎকালীন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর তার বক্তব্য শেষে কবি কামাল চৌধুরীর ‘পদ্মা সেতু’ কবিতা থেকে কিছু অংশ আবৃত্তি করে শোনান। (বাংলা ট্রিবিউন, ২৮ জুন ২০২২)।


২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার জন্য দোয়া চেয়ে জাতীয় সংসদে গান পরিবেশ করেন মমতাজ বেগম। সুরে সুরে বলেন, ‘আমার নেত্রী শেখ হাসিনা তুলনা যার নাই/ আপনার আমার নেত্রী যিনি জাতির পিতার কন্যা তিনি/ আমরা সবাই তারে চিনি যার তুলনা নাই/ আমার নেত্রী শেখ হাসিনা, এই বিশ্ব যারে করে গণ্য/ তার কারণেই আমরা ধন্য।/ এমন একজন নেত্রীর জন্য আমি দোয়া চাই/ সবার হাতে তালি চাই।’ গানের একপর্যায়ে মমতাজের জন্য নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলে তার মাইক বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় বক্তব্য শেষ করার জন্য তাকে বাড়তি এক মিনিট সময় দেওয়া হয়। (সমকাল, ২৯ জানুয়ারি ২০২০)।


বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে সংসদে মমতাজের গানের শুরুটা আরও আগে। ২০১৪ সালের জুন মাসে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মমতাজ গেয়ে শোনান: ‘হায়রে বাঙালি, ওরে বাঙালি, তোরা বুঝবি রে একদিন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তোদের মাঝে থাকবে না যেদিন। শেখ হাসিনার জন্য আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তা না হলে ওসব কথা বলাই যেত না।’ (প্রথম আলো, ১৯ জুন ২০১৪)।


২০২০ সালের মার্চ মাসে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন উপলক্ষ্যে শেখ হাসিনার শাড়ির রঙের প্রশংসা করতে গিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) এমপি মুজিবুল হক বলেছিলেন, ‘মাননীয় সংসদ নেত্রীকে দেখে আজকে মনে হলো যে বসন্ত খুব শিগগির।’ তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মজা করে বলেন, ‘আমি কিন্তু বাসন্তী রং পরিনি। এখানে অনেক রং আছে। কালোও আছে। আমার মনে হচ্ছে মাননীয় সংসদ সদস্য কালার ব্লাইন্ড। এটা বাংলা করলে হয় রংকানা। জানি না, আজকে বাড়িতে গিয়ে ওনার কপালে কী আছে।’ (প্রথম আলো, ০৮ মার্চ ২০২০)।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও