ছায়ানটের বর্ষবরণ: বাঙালির প্রতিবাদ ও প্রাণের স্পন্দন
ঢাকার রমনা বটমূলে যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়, তার একটি গভীর প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস রয়েছে। পয়লা বৈশাখের এই উৎসব বাঙালি জাতিসত্তার ধারায় মিশে আমাদের স্বরূপ সন্ধানে সহায়ক হয়েছে। এটি আমাদের জাতীয় সংকটের গর্ভ থেকে সঞ্জাত, শুধু আনন্দের আয়োজন নয়।
পাকিস্তানি শাসকেরা প্রথম বাঙালির ওপর চড়াও হয়েছিল মাতৃভাষা বাংলাকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টার মাধ্যমে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে তারা বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ থামেনি। অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি তারা শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের ওপর সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধ আরোপ করতে থাকে। তাদের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায় রবীন্দ্রনাথ—কারণ তৎকালীন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানেই রবীন্দ্রসংগীত। সেই গানের মাধ্যমেই উচ্চারিত হতো দিনবদলের অঙ্গীকার ও প্রতিবাদ। একসময় শিল্পীরা লাল টিপ পরে প্রতিবাদী গান গাইতেন, ফলে রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি লাল টিপও নিষিদ্ধ হয়। সন্জীদা খাতুনের জীবনীগ্রন্থ থেকে এ তথ্য জানা যায়।
পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে রবীন্দ্রবিরোধী আন্দোলন চালায় সরকার। রবীন্দ্রনাথকে পাকিস্তানে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলে এ দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা প্রতিবাদে সরব হন। সে সময় জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন চলছিল। ঢাকায় জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনে তিনটি কমিটি গঠিত হয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে একটি, বিচারপতি এস এম মুরশেদের নেতৃত্বে নাগরিকদের একটি এবং প্রেসক্লাবে তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের অপর একটি কমিটি। সম্মিলিতভাবে ২৪ থেকে ২৭ বৈশাখ চার দিনব্যাপী রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালিত হয়। উদ্বোধনী বক্তৃতায় বিচারপতি মুরশেদ রবীন্দ্রনাথকে ‘উদার মানবতার কবি’ আখ্যা দেন। সামরিক শাসনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে এই অনুষ্ঠানমালা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে উদ্দীপ্ত করে এবং রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এক ধাপ এগিয়ে যায়।
জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজকদের এক আনন্দ-সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা সাংস্কৃতিক আন্দোলন অব্যাহত রাখতে একটি সংগঠন গড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেদিনই বেগম সুফিয়া কামালকে সভাপতি ও ফরিদা হাসানকে সম্পাদক করে ‘ছায়ানট’-এর প্রথম কমিটি গঠন করা হয়।
প্রথম দিকে ছায়ানটে শ্রোতার আসর হতো। প্রথম আসরে গেয়েছিলেন ফিরোজা বেগম, দ্বিতীয়টায় ফাহমিদা খাতুন। পরে গাইলেন বারীণ মজুমদার, ইলা মজুমদার। কখনো সেতার বাজালেন খাদেম হোসেন খান। সন্জীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হক ছিলেন সংগঠক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে। একসময় ওয়াহিদুল হক একটি গানের স্কুল খোলার প্রস্তাব দেন, সেখান থেকেই শুরু হয় ছায়ানট সংগীত বিদ্যালয়। প্রথমে মখলেসুর রহমান (সিধু ভাই)-এর টাকায় স্কুল চলত, পরে আরও অনেকে চাঁদা দেন। এই স্কুলই বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিমণ্ডলে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার মূলকেন্দ্রে পরিণত হয়। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন সবাইকে ‘মুসলমান’ বানানোর চেষ্টা চালিয়েছে, বাঙালির আলাদা অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে, বাঙালি সংস্কৃতিকে গলাটিপে হত্যা করতে চেয়েছে—সেই সময় ছায়ানট প্রতিবাদী হয়েছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশবাসীকে একত্র করার চেষ্টা করেছে।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন ধর্মের অজুহাতে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন সেই অপশাসন অগ্রাহ্য করে বাঙালি সংস্কৃতিকে জাতির জীবনে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ছায়ানট নানা উদ্যোগ নেয়। পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন হয়ে ওঠে এক আন্দোলন। উৎসবের আশ্রয়ে প্রতিবাদের উন্মেষ ঘটে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।
১৯৬৭ সালে ঢাকার রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখের আবাহনী অনুষ্ঠান শুরু করে ছায়ানট। এই স্থান নির্বাচনের পেছনেও ইতিহাস আছে। পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকে ঘরোয়াভাবে নববর্ষ পালিত হতো। কৃষ্ণচূড়ার ডালে সাজানো সান্ধ্য আসরে মিলিত হতেন কিছু সংস্কৃতিমনা মানুষ—কারও বাড়ির ড্রইংরুমে, কারও আঙিনায় প্রাণপ্রাচুর্যের সঙ্গে। ছায়ানটের কর্তাব্যক্তিরা বর্ষবরণের জন্য খুঁজছিলেন উন্মুক্ত স্থান। ১৯৬৭ সালে নিসর্গবিদ ড. নওয়াজেশ আহমদ প্রথম রমনা বটমূলের সন্ধান দেন। তখন জায়গাটি ছিল মানুষের চলাচলহীন, বড় বড় ঘাসে ঢাকা। সেখানে ছিল এক বিশাল অশ্বত্থ বৃক্ষ। আমন্ত্রণপত্রে লেখা হলো ‘বটমূল’—কারণ পঞ্চবটের মধ্যে অশ্বত্থ, বট, বিল্ব, আমলকী ও অশোক রয়েছে। ‘বটমূল’ শব্দটি শ্রুতিমধুর। তাই অশ্বত্থতলাকে বটমূল বলতে উদ্যোক্তাদের কারও আপত্তি ছিল না। ছায়ানটের সুহৃদ ও কর্মীরা মিলে জায়গাটা পরিষ্কার করে অনুষ্ঠানোপযোগী করেন।
গোড়ার দিকে সেখানে সংগীত পরিবেশনায় শিল্পীদের বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে। সন্জীদা খাতুন লিখেছেন: ‘বটগাছের উপর থেকে ছোট ছোট শুঁয়ো পোকা ঝরে পড়তো ঘাড়ে, মাথায়, গায়ে। অনুষ্ঠান শেষে হাত-পা-ঘাড়-চুল লাল করে ফেলত সবাই। আশ্চর্যের বিষয়, গান চলাকালে সবাই চুপ করে সয়ে যেত সেই যন্ত্রণা। বেশি নড়াচড়া করলে দেখতে খারাপ হবে, বর্ষবরণে গান গাইতে গাইতে অস্থিরতা প্রকাশ করলে অনুষ্ঠানের সৌকর্য নষ্ট হবে—শিল্পী আর শিক্ষার্থীরা সে কথা মনে রেখেছেন। পরের বছর গাছের ডালের ছোট ছোট কাঠি দিয়ে দিয়েছিলাম সবার হাতে, যেন ধীরে ধীরে শরীর থেকে পোকা সরানো যায়। পোকা সরিয়ে দেওয়া হোক বা যা-ই হোক, সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রশান্ত মুখে “আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও”—এই প্রার্থনা উচ্চারণ করতেই হবে!’
প্রথম দিকে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে কেবল রবীন্দ্রসংগীত থাকত। পরে যুক্ত হয় নজরুল, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলালের গান; আরও পরে দেশের গান, লোকগীতি, লালনের গান। প্রথম প্রথম পয়লা বৈশাখের ভোরে রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে খুব জনসমাগম হতো না। তবে ধীরে ধীরে শ্রোতা বাড়তে থাকে। তখন গানের শিল্পী পাওয়াও কঠিন ছিল। সন্জীদা খাতুন লিখেছেন, ‘একক গানের জন্য শিল্পী সংগ্রহ করতে হতো বাইরে থেকে। কলিম শরাফী, বিলকিস, নাসিরুদ্দীন, মালেকা আজিম খান, ফাহমিদা খাতুন, জাহানারা ইসলাম, মাহমুদা খাতুন, চৌধুরী আবদুর রহিম, পাকিস্তানের শেষ দিকে আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত সরকারের বিরাগভাজন আমলা শামসুর রহমানের পত্নী আফসারী খানম...আরো কতজন!’
পরবর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী চেতনার পালে যত হাওয়া লেগেছে, ততই উৎসবমুখর হয়েছে নববর্ষের আয়োজন। পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধসহ নানা সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধ আরোপ করলেও নববর্ষে লেগেছে নিত্যনতুন উদ্দীপনা। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে সরকার পয়লা বৈশাখকে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা করে।
বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রথম ইস্যু ছিল ভাষা। একুশে ফেব্রুয়ারির স্মারক শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে বাঙালি প্রথম ঐক্যবদ্ধ হয়। দ্বিতীয়বার বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয় পয়লা বৈশাখকে ঘিরে। নববর্ষের এই উৎসব বাঙালিকে আরেক মিলনবিন্দুতে ঘনিষ্ঠ করে। পয়লা বৈশাখ ছিল বাঙালিত্বের শপথ নেওয়ার দিন। পোশাক-আচরণে বাঙালিত্বের বলিষ্ঠ ঘোষণা হতো সেদিন। বাঙালির কবিতা, সাহিত্য, নৃত্যগীতে আমাদের অধিকার চিরন্তন—এসব কথা বলা, বোঝা ও বোঝানোর শুরু হয়েছিল বটমূলের প্রভাতি সমাবেশে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলা বর্ষবরণ
- ছায়ানট