‘কৃষক কার্ড’ কি আত্মনির্ভর কৃষির রূপান্তর ঘটাবে
পুঁজির বিস্তার, মুনাফার নিয়ন্ত্রণ, পণ্যকরণ ও বাজার সম্প্রসারণের ভেতর দিয়ে খাদ্যব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বৈশ্বিক ক্ষমতাকাঠামোর কর্তৃত্ব। একমুখী বাজারব্যবস্থা কৃষকসমাজকে উৎপাদনের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। কৃষির ইতিহাসে শস্যের আরেকবার নির্দয় গণবিলুপ্তি এবং কৃষকের নয়া বন্দিদশা ঘটেছে ষাটের দশকে তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লব’ প্যাকেজের মাধ্যমে। ফসলের বৈচিত্র্য ধ্বংস করে কৃত্রিম সার, বিষ ও পাতালপানি–নির্ভর ‘আধুনিক কৃষি প্রকল্প’ চাপিয়ে দিয়ে উৎপাদনের সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি। নীতি, আইন, প্রকল্প, বাজেট ও কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্র বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাহাদুরির বৈধতা দিয়েছে। কৃষির এই ধারাবাহিক রূপান্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, বৈচিত্র্য ক্ষয়, মুনাফার বিস্তার কিংবা প্রাণডাকাতিতে কৃষকের কোনো ভূমিকা নেই। আজকের নয়া–উদারবাদী বাজারে কৃষক কেবল এক স্বীকৃতিহীন বন্দী মজুর।
গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সরকার কি কৃষকের চারপাশের প্রশ্নহীন সব দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ‘কারাগার’ চুরমার করতে পারবে? আশা হলো নির্বাচনী ইশতেহারে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি সেই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। দলটি এক আত্মনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছে। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে কেন কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষি এখনো আত্মনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক নয়, এই আলাপ কি আমাদের সংসদে আছে? দেশের সব জাতি, বর্গ ও জেন্ডারের গরিব কৃষক, বর্গাচাষি, ভূমিহীন কৃষিমজুর, জুমিয়া ও কৃষিশ্রমিকেরা কি এই আলাপে অংশ নিতে পারবেন? চর, গড়, পাহাড়, টিলা, বরেন্দ্র, বন, দ্বীপ, উপকূল, হাওর কিংবা বিল অঞ্চলের কৃষিজীবনের বৈচিত্র্য ও বঞ্চনার বয়ান থেকে কি আত্মনির্ভর কৃষিব্যবস্থার দলিল রচিত হবে?
কৃষিব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তর প্রশ্নে সরকার তার নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো সর্বদা সামনে রাখবে আশা করি। সরকারের সামনে এক জটিল, বৈষম্যমূলক ও অনিরাপদ নয়া–উদারবাদী কৃষিব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে। এই কৃষিব্যবস্থাকে জবরদস্তি করে বা অতি উৎসাহিত হয়ে আজকেই হটিয়ে দেওয়া অসম্ভব। তবে কৃষির ধারাবাহিক রূপান্তরের ইতিহাসকে নৈর্ব্যক্তিকভাবেই পাঠ করতে হবে। সবুজ বিপ্লব প্রকল্প, বহুজাতিক বাণিজ্য বিস্তার কিংবা দেশীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যেভাবে কৃষির লাগাতার দখল, দূষণ ও দস্যুতা ঘটেছে, সেসব আলাপে আনতে হবে।
সব রেজিমে নেওয়া কৃষি প্রকল্প, কৃষিবিষয়ক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি ও অবহেলা, সাফল্য কিংবা সংকটগুলোকে জনবিশ্লেষণের ময়দানে দাঁড় করাতে হবে। কৃষকের বহুমুখী ও বহুস্তরীয় বঞ্চনা ও লড়াইয়ের রক্তদাগগুলোকে কৃষকের জমিন থেকেই পাঠ করতে হবে। বীজ, লোকায়ত জ্ঞান, জমি, জলা, জঙ্গল, পাহাড়, নদী, খাল কীভাবে গরিবের সর্বজনীন প্রাকৃতিক পুঁজি থেকে আজকে ক্ষমতাবানদের বাণিজ্যিক পুঁজি হয়ে উঠল, মূলত কৃষির রূপান্তরের মূল জিজ্ঞাসাটিই এখানে টগবগ হয়ে আছে। রাষ্ট্র কি আজ এই জিজ্ঞাসার জন্য প্রস্তুত?
আজ শস্যের উৎপাদন বেড়েছে সত্য, কিন্তু আমাদের শরীরে ঢুকেছে ভয়াবহ বিষ। মাটি, মানুষ, মাছ, পাখি, পানি, মুরগি, গরু, ফসল, দুধ আজ আক্রান্ত। ক্যানসার রোগীদের বড় অংশটাই গ্রামীণ কৃষিজীবী। রাসায়নিক বিষ, সিসা-ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু কিংবা মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে বড় হচ্ছে আমাদের রুগ্ণ শিশুরা। কৃষিকাজের জন্য কৃষক আজ বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের ঘাড় মটকে মুনাফা লুটছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। বাজার সিন্ডিকেট ক্রেতা-ভোক্তা-উৎপাদক সবাইকে জিম্মি করে রেখেছে। বাড়ছে জলবায়ুসংকট। বাড়ছে লবণাক্ততা, খরা, তাপপ্রবাহ, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ি ঢল কিংবা বন্যার তীব্রতা।
বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে কৃষির এমন এক রক্তাক্ত জমিনে দাঁড়িয়ে কৃষির ন্যায্য রূপান্তর প্রশ্নে সরকারের প্রথম ও অন্যতম কাজ হবে দেশের কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত কার্যকর আলাপ ও মতামত গ্রহণকে এক রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি হিসেবে গড়ে তোলা। সরকারঘোষিত কৃষক কার্ড কর্মসূচির ভেতর দিয়েই দেশব্যাপী সরকার কৃষক জনসংযোগ ও আলাপচারিতার এই কাজ শুরু করতে পারে।
কেবল জমি চাষের নিরিখেই কৃষক বাছাই নয়
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শিরোনামে ৫১ দফার ইশতেহারে বিএনপি কৃষি খাতের মৌলিক রূপান্তরের জন্য অঙ্গীকার করেছে। আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক এক আধুনিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। কৃষক কার্ড, কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ফসলের ন্যায্যমূল্য, কৃষিজমি সুরক্ষা, কৃষিবিমা, শস্যবিমা, পশুবিমা, মৎস্যবিমা, কৃষি-উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম, অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপণ্য উৎপাদন, খাল খনন, হাওরে ইজারা প্রথা বাতিল, জৈব কৃষি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব কৃষির ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।
নির্বাচনী ইশতেহারের ঘোষণা বাস্তবায়ন হিসেবে ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি আগামী পয়লা বৈশাখ কৃষক কার্ডের সূচনা করতে যাচ্ছে সরকার। বলা হচ্ছে, এই কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা প্রায় ১০ ধরনের সুবিধা ও সেবা পাবেন। ন্যায্যমূল্যে সার-বীজ ও কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি, সরকারি প্রণোদনা, ন্যায্যমূল্যে সেচসুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষিবিমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উৎপাদন বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও রোগবালাই দমনে পরামর্শ এই কার্ডের মাধ্যমে পাবেন কৃষকেরা। মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিও এই কার্ড পাবেন। সরকারি প্রণোদনার টাকা সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে যাবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, স্থানীয় সরকারের প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে এই কার্ডের জন্য আবেদন করতে হবে। ‘মাই জিওভি’ ওয়েবসসাইটে গিয়ে আবেদন করা যাবে।