বৈশাখের অর্থনীতি: আনন্দের আড়ালে সাধারণের জীবন
বৈশাখ আসে প্রতিবছর। কিন্তু যেভাবে আসে, সেটা প্রতিবারই একটু আলাদা। গ্রামের বটতলায় মেলার সুর ওঠে, শহরের রাস্তায় লাল-সাদা পোশাকের ঢল নামে, দোকানে দোকানে নতুন সাজ। মানুষ ভুলে যেতে চায় পুরোনো বছরের ক্লান্তি। নতুন বছরকে বরণ করতে বুকভরা আশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে পথে। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে একটি বিশাল অর্থনৈতিক স্রোত চুপচাপ বয়ে যায়, যা দেশের উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত সবকিছুকে নাড়িয়ে দেয়।
রমজান, ঈদ আর পয়লা বৈশাখ যখন কাছাকাছি সময়ে আসে, তখন বাজারে যে টাকার জোয়ার তৈরি হয়, তা সত্যিই অভূতপূর্ব! সরকারি ও বেসরকারি হিসাব মেলালে দেখা যায়, শুধু এই উৎসব মৌসুমে অর্থনীতিতে যোগ হয় অতিরিক্ত দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন। পোশাকের বাজারে যোগ হয় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, নিত্যপণ্যে ২৭ হাজার কোটি, জাকাত ও ফিতরা বাবদ আসে ৬৭ হাজার কোটি টাকা। পরিবহন থেকে পর্যটন, মিষ্টির কারখানা থেকে ফুলের বাজার—সবখানেই উৎসবের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু পয়লা বৈশাখকে আলাদা করে দেখলে অর্থনীতিবিদদের অনুমান বলছে, এই একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। পোশাক খাতের হিসাব আরও চমকে দেওয়ার মতো। অভ্যন্তরীণ পোশাক প্রস্তুতকারকদের তথ্য অনুযায়ী, পয়লা বৈশাখে সারা দেশে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়। ফ্যাশন হাউসগুলোতে সারা বছরের মোট বিক্রির ২৫ থেকে ২৮ শতাংশই হয় এই একটি উৎসবকে ঘিরে। প্রতিবছর এই সংখ্যা আরও বাড়ছে। করোনার সময় যখন বৈশাখ উদ্যাপন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন শুধু পোশাক খাতেই ক্ষতি হয়েছিল ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। সেই সংখ্যাটাই বলে দেয় উৎসবটি অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি বলা যায় বৈশাখ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বড় চালিকাশক্তি? হ্যাঁ, অবশ্যই। কিন্তু এই চালিকাশক্তির সুফল কি সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটু থামতে হয়। গ্রামের তাঁতি, যিনি সারা রাত জেগে একটি শাড়ি বোনেন, তিনি পান মাত্র ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা মজুরি। সেই শাড়িই শহরের নামী দোকানে বিক্রি হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায়। মাঝখানে যে মুনাফার পাহাড়, তার সিংহভাগ চলে যায় শহরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের হাতে।
টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পী আর পাবনার লুঙ্গি বোনা মানুষগুলো বৈশাখের সবচেয়ে বড় অবদানকারী, অথচ তাঁরাই পান সবচেয়ে কম। মৃৎশিল্পীর কথাও একই রকম। বৈশাখী মেলায় তাঁর হাতে গড়া পুতুল, শখের হাঁড়ি বিক্রি হয়, কিন্তু ফড়িয়ার হাত ঘুরে সেই পণ্য শহরের মেলায় পৌঁছালে দাম বেড়ে যায় কয়েক গুণ। লাভের অংশটা কিন্তু মৃৎশিল্পীর কাছে আর ফেরে না।
এখানে একটি পুরোনো সত্য মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। বাংলা সনের জন্ম ১৫৫৬ সালে, প্রচলন ১৫৮৪ সালে, সম্রাট আকবরের আমলে। উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের ফসলের মৌসুম বুঝে খাজনা আদায় করা। সেই উৎসবের শিকড় ছিল মাটিতে, গ্রামে, কৃষিতে। কালের পরিক্রমায় সেই গ্রামীণ উৎসব এখন অনেকটাই শহরের উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। রমনার বটমূলে শোভাযাত্রা, অভিজাত রেস্তোরাঁয় পান্তা-ইলিশের পাত, শপিং মলে বৈশাখী পোশাকের বাহার—এগুলো শহরের বৈশাখ।
কিন্তু গ্রামের বৈশাখ আলাদা। সেখানে বটতলার মেলায় একটু চিড়া-মুড়ি, ছেলেমেয়েদের হাতে বাঁশের বাঁশি আর মাটির পুতুল, নাগরদোলার আনন্দ, যাত্রাপালার উত্তেজনা। পার্বত্য চট্টগ্রামে তরুণ-তরুণীদের নাচ আর জলকেলি। রাজশাহীর শিবতলী কিংবা দিনাজপুরের ফুলতলীর মেলায় হাজারো মানুষের ভিড়। গ্রামের বধূ তাঁর জামাতাকে নিমন্ত্রণ জানান, পিঠা-পুলির আয়োজন করেন। দুটো বৈশাখ পাশাপাশি চলে, কিন্তু দুটোর মধ্যে আর্থিক ফারাকটা বিশাল।
পান্তা-ইলিশের প্রসঙ্গ এলে একটি মৃদু সমালোচনা না করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। গ্রামের মানুষ নববর্ষে শখ করে পান্তা খায় না। ইলিশ তো অনেকে চোখেই দেখে না। এই রেওয়াজটা তৈরি হয়েছে শহরে। আর এই রেওয়াজের কারণে চৈত্রসংক্রান্তির আগে থেকেই ইলিশের দাম ছুঁয়ে যায় আকাশ। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়েন নদীতে। ভবিষ্যতের মাছ ধরে আজকের উৎসব পালন করা হয়। এটা সংস্কৃতির নামে প্রকৃতির বিরুদ্ধে একটি নীরব অবিচার।
তাহলে বৈশাখের এই বিশাল অর্থনীতিকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়? সরকার এখানে কী ভূমিকা রাখতে পারে? প্রথম কথা হলো, বৈশাখী মেলাকে শুধু উৎসবের আয়োজন হিসেবে না দেখে একটি নিয়মিত বিপণন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। দেশের প্রতিটি জেলায় যদি কারুশিল্পী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ করে দেওয়া যায়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর হাত কেটে সরাসরি লাভ পাবেন উৎপাদক। বিসিকের বৈশাখী মেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারুশিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে, কিন্তু সেটা সীমিত এবং ঢাকাকেন্দ্রিক। এই সুযোগ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ই-কমার্সকে কাজে লাগানো দরকার। চীনের আলিবাবা কীভাবে গ্রামীণ উৎপাদকদের সরাসরি শহরের ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করেছে, সেই মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। বাংলাদেশে ই-কমার্সের বাজার দ্রুত বাড়ছে। সরকার যদি কারুশিল্পী ও তাঁতিদের জন্য ডিজিটাল বিপণনের প্রশিক্ষণ এবং প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে সহায়তা করে, তাহলে বৈশাখের মৌসুমে গ্রামীণ পণ্যের বিক্রি কয়েক গুণ বাড়তে পারে। উৎসব-পার্বণে ডিজিটাল লেনদেন যে হারে বাড়ছে, সেটা আশার কথা। ২০২৪ সালে শুধু ঈদের মাসে মোট ডিজিটাল লেনদেন মোট লেনদেনের ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। এই ডিজিটাল যুক্ততাকে কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ বিক্রেতাকে বাজারে আনা সম্ভব।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পহেলা বৈশাখ
- অর্থনীতি
- বর্ষবরণ