যখন “সম্মান” হয়ে ওঠে মৃত্যুদণ্ড
মেয়েটির নাম পারুল আক্তার। তার বাবার নাম কুদ্দুছ মিয়া। তাদের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতীর ঘড়িয়া পশ্চিমপাড়ায়। ২০১২ সালের ২৮ মে বাসা থেকে পালিয়ে একই গ্রামের নাসির উদ্দিন (বাবু) কে বিয়ে করেছিল পারুল। এরপর তিন বছর তারা ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় বসবাস করেন। পারিবারিক কলহের জেরে ২০১৫ সালে পারুল বাবার কাছে ফিরে যেতে চান। এই সুযোগে ২০১৫ সালের ২২ জুলাই পারুলকে কৌশলে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি কলন্দপুর এলাকায় নিয়ে যান কুদ্দুছ মিয়া। এরপর পারুলকে খুন করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেন। পরিবারের অমতে মেয়ে অন্যত্র বিয়ে করায় বাবা িএই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটান ভাড়াটে খুনিকে দিয়ে। যা কেতাবি ভাষায় ‘অনার কিলিং’ নামে পরিচিত।
অনার কিলিং (Honor Killing) বলতে এমন এক ধরনের হত্যাকে বোঝায়, যেখানে পরিবারের কেউ—সাধারণত নারী—পরিবার বা সমাজের তথাকথিত “সম্মান” নষ্ট করেছে মনে করে তাকে হত্যা করা হয়। সহজ ভাবে বললে পরিবারের সম্মান রক্ষা করার নামে নিজেরই সন্তান, বোন, স্ত্রী বা আত্মীয়কে হত্যা করা—এটাই অনার কিলিং।
যেসব কারণে অনার কিলিং ঘটে, সাধারণত পরিবারের অমতে প্রেম বা বিয়ে করা, নিজের পছন্দে জীবনসঙ্গী নির্বাচন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ (সত্য বা মিথ্যা), পোশাক, চলাফেরা বা জীবনধারায় “অমর্যাদা” মনে হওয়া। এই ধারণা আসলে গভীরভাবে ভ্রান্ত এবং মানবাধিকারবিরোধী। কোনো মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা জীবনের পছন্দ কখনোই হত্যার কারণ হতে পারে না। আইনের দৃষ্টিতে অনার কিলিং একটি গুরুতর অপরাধ। এটি সরাসরি হত্যা হিসেবে গণ্য হয় এবং অধিকাংশ দেশেই এর জন্য কঠোর শাস্তি রয়েছে। “সম্মান” কখনো কারো জীবন নেওয়ার মাধ্যমে রক্ষা হয় না।
বরং সত্যিকারের সম্মান হলো—মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে সম্মান করা। আমাদের দেশে অনার কিলিং ঘটে, কিন্তু তা নিয়মিত বা প্রকাশ্যভাবে স্বীকৃত কোনো প্রথা নয়; বরং এটি বিচ্ছিন্ন, লুকানো এবং আইনত গুরুতর অপরাধ। তবুও কেন এমন ঘটনা ঘটে—তার পেছনে কিছু গভীর সামাজিক ও মানসিক কারণ আছে। অনেক সমাজে পরিবারের সম্মানকে ব্যক্তির আচরণের সাথে এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হয়, যেন একজনের সিদ্ধান্ত পুরো পরিবারের মর্যাদা নির্ধারণ করে। বিশেষ করে নারীর পছন্দ, প্রেম বা বিয়ে—এসবকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা থেকে এই সহিংসতা জন্ম নেয়।
আমাদের সমাজ এখনো অনেকাংশে পুরুষতান্ত্রিক। এখানে নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্তকে সহজভাবে নেওয়া হয় না। যখন কোনো নারী নিজের পছন্দে জীবনসঙ্গী বেছে নেয়, তখন সেটাকে “অবাধ্যতা” হিসেবে দেখা হয়, যা কিছু মানুষের মধ্যে চরম প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
“মানুষ কী বলবে”—এই ভয় অনেক পরিবারকে অস্বাভাবিক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। আত্মীয়-স্বজন বা সমাজের কথাকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, নিজের সন্তানের জীবনও তখন গৌণ হয়ে পড়ে।
অনার কিলিং সাধারণত প্রকাশ্যে হয় না; অনেক সময় এটিকে আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা বলে আড়াল করা হয়। ফলে প্রকৃত সংখ্যা বোঝা কঠিন, এবং অপরাধীরা অনেক সময় শাস্তি এড়িয়ে যায়—যা এই প্রবণতাকে পুরোপুরি দমন করতে বাধা সৃষ্টি করে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- অনার কিলিং