বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে ভিন্ন পথে বিএনপি
সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও বিচারক নিয়োগের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করতে জাতীয় সংসদে বিল তুলেছে বিএনপি সরকার। যদিও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারে ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে দলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতের কথা বলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিএনপির বর্তমান অবস্থান তাদের অঙ্গীকারের বিপরীত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে একটি বড় বিষয় ছিল বিচার বিভাগের সংস্কার। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচার বিভাগ দলীয়করণের ভুক্তভোগী বিএনপি এবং তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলার পর বিএনপির বর্তমান অবস্থান অনেকের কাছে অসংগতিপূর্ণ মনে হচ্ছে। অধ্যাদেশ দুটি বাতিলের জন্য সংসদে বিল তোলায় বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে আগের অবস্থান থেকে সরে আসার অভিযোগ উঠছে। এর ফলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তাহলে কি আগের প্রতিশ্রুতিগুলো শুধুই রাজনৈতিক কৌশল ছিল?
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। এই কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে। সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে ১৫টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল করা ও ১৬টি এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, অর্থাৎ এই ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে।
যে চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছিল, তার মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫। এই অধ্যাদেশ দুটি পাস হলে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে যেত এবং উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগও সরকারের প্রভাবমুক্ত রাখার সুযোগ তৈরি হতো।
অবশ্য গত সোমবার আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় সংসদে এই দুই অধ্যাদেশ বাতিল করতে পৃথকভাবে দুটি বিল উত্থাপন করেন। বিলগুলো হলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ নিয়ে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পর্যালোচনা ও পরামর্শ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচারক নিয়োগের অধ্যাদেশটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ নিয়ে বলা হয়, বর্তমান ব্যবস্থায় সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ রয়েছে। বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের (বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা) বিষয়ে সরকারের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ ব্যবস্থায় বিচারকেরা কারও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে থাকেন না। ফলে তাঁদের একজন ব্যক্তির অন্যায় সিদ্ধান্তের শিকার হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
এতে আরও বলা হয়, অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবেন। সরকারের সঙ্গে কাজের কোনো সমন্বয় থাকবে না। একজন ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণ বিচারকদের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অবশ্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পর্যালোচনা ও পরামর্শ প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংশোধনীসহ অধ্যাদেশটি সংসদে পাস করার সুপারিশ করা হয়েছে; কিন্তু সংসদের বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি বাতিলের সুপারিশ করেছে। এ নিয়ে বিশেষ কমিটিতে থাকা বিরোধী দলের তিন সদস্যের আপত্তি ছিল।