পরিকল্পনা কঠিন, বাস্তবায়ন আরও কঠিন

www.ajkerpatrika.com মাসুদ কামাল প্রকাশিত: ০১ জুন ২০২৬, ১২:৪৯

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকারের যে পতন হয়েছে, এটা এখন পুরোনো খবর। কেন হারল তারা—এ নিয়ে এরই মধ্যে নানা গবেষণা হচ্ছে। তৃণমূল সরকার জনহিতকর অনেক উদ্যোগ নিয়েছিল। কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্য সাথি, কৃষকবন্ধু, রূপশ্রী, খাদ্য সাথি, সবুজ সাথি—এ রকম আরও অনেক কিছু। রাজ্যের সব পরিবারকে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হতো, চিকিৎসার জন্য একটি পরিবারের পেছনে বছরে প্রয়োজনে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করা হতো। মেয়েদের বৃত্তি দেওয়া হতো। দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়ের সময় এককালীন একটা অনুদান দেওয়া হতো। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য দেওয়া হতো একটা করে সাইকেল। এ রকম আরও বেশ কিছু প্রকল্পের মধ্যে একটি ছিল ‘দুয়ারে সরকার’। এর অর্থ হচ্ছে—জনগণকে আর কোনো কাজের জন্য সরকারের দুয়ারে দুয়ারে ধরনা দিতে হবে না, বরং সরকারই জনগণের দুয়ারে চলে যাবে! সন্দেহ নেই খুবই চমৎকার, জনহিতকর প্রকল্প। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত এত অসাধারণ প্রকল্প গ্রহণের পরও নির্বাচনে তাদের ভয়ংকর পরাজয় কেন হলো? সে আলোচনায় একটু পরে আসছি। তার আগে বরং আমাদের কথা একটু বলে নিই।


কদিন আগে আমাদের বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ হলো। বিএনপির মিডিয়া সেল তাদের ফেসবুক পেজে ১০০ দিনের সাফল্যের বেশ কিছু ফিরিস্তি প্রকাশ করেছে। ১০০ দিনের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিএনপি দাবি করেছে, ‘এখন ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান না, বরং প্রধানমন্ত্রীই তাঁদের দুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছেন।’ বিএনপির এমন দাবি যে কেবলই ফাঁকা বুলি নয়, সেটা দেখা গেল দুই দিন পরই। বুধবার ১০০ দিন পূর্ণ হলো, বৃহস্পতিবার ছিল ঈদুল আজহা, আর শুক্রবারই দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীকে সড়কে। শুক্রবার দিন জুমার নামাজের পর প্রধানমন্ত্রী নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গেছেন বর্জ্য অপসারণের বাস্তব চিত্র দেখার জন্য। এ সময় তিনি সঙ্গে নিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসকসহ আরও কয়েকজনকে। কয়েকটি জায়গায় তিনি অনিয়ম পেয়েছেন, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাও নিয়েছেন। দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সাসপেন্ড করেছেন।

কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ডকে সমালোচনাও করছেন। তাঁদের মতে, খলিফা ওমরের সময় এখন আর নেই। বাস্তবতা পাল্টে গেছে। এ রকম কাজে চমক আছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নেই। তাঁদের কথায় যুক্তি আছে। তারপরও আমি কিন্তু বিষয়টাকে একটু অন্যভাবে দেখি। আমার মতে, এ ধরনের কাজে সুফল অবশ্যই থাকবে। আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে সেই এরশাদ থেকে শুরু করে সব সরকারপ্রধানের কর্মকাণ্ডই দেখার সুযোগ হয়েছে। সেসব মাথায় রেখেই বলছি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু কাজ এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী বলে মানুষের কাছে মনে হচ্ছে। উনি এরই মধ্যে এমন কিছু উদাহরণ তৈরি করেছেন, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী এই যে দুজন নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করলেন, এর প্রভাব নিশ্চয়ই এ রকম নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে পড়বে। আগামী বছর নিশ্চিতভাবেই এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।


আমি সব সময়ই বলি, প্রতিষ্ঠানগত কোনো অনিয়ম হলে নিম্নস্তরের কর্মচারীকে দায়ী করা ঠিক নয়। বরং ব্যবস্থা নিতে হবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে। একবার ব্যবস্থা নিলে নতুন যিনি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আসবেন, তিনি শুরু থেকেই এমনভাবে প্রতিষ্ঠানটি চালাবেন, যার ফলে কেউ আর দায়িত্বে অবহেলার সাহস পাবেন না। এটাই হচ্ছে কার্যকর পদ্ধতি। দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করায় এই যে এবার আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করা হলো, ভবিষ্যতে যিনি এই পদে আসবেন, তিনি এই ঘটনাকে বিবেচনায় রেখেই কাজ করবেন।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কেবল প্রধানমন্ত্রী একা করলেই কি হবে? অন্য মন্ত্রীরা যদি নিজ নিজ দায়িত্বটি পালন না করেন, তাহলে কীভাবে চলবে? এই যে বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থার মনিটরিং, এটা তো প্রধানমন্ত্রীর কাজ ছিল না। এটা প্রধানত ছিল দুই সিটির প্রশাসকের কাজ, আরও একটু ওপরের দিকে গেলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তাঁরা সেই দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেননি বলেই হয়তো প্রধানমন্ত্রীকে নামতে হয়েছে রাস্তায়।


আমরা এর আগেও দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু ক্ষেত্রে কিছু অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের একেবারে শুরুর দিকেই জানিয়েছেন—তিনি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবেন না, সরকারি ড্রাইভার নেবেন না, সরকারি তেল নেবেন না। তাঁকে কি তাঁর সহকর্মীদের কেউই অনুসরণ করেছেন? উদাহরণটি তিনি কাদের জন্য তৈরি করেছেন? অন্য মন্ত্রীদের জন্যই তো। তাহলে তাঁরা এটা অনুসরণ কেন করলেন না? তাঁরা কি বোঝাতে চাইলেন, প্রধানমন্ত্রী ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? অথবা বলতে চাইলেন, উনি ভুল করেছেন বলে কি আমরাও ভুল করব?


এই যে সরকারি গাড়ি-তেল-ড্রাইভার না নেওয়া, এতে যে দেশের অর্থনীতির বিশাল কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়ে যাবে, তা নয়। তবে সব মন্ত্রী এটা করলে জনগণের কাছে একটা মেসেজ যেত। সরকার যেন বোঝাতে পারত, আমরা মন্ত্রী হয়েছি কিছু নেওয়ার জন্য না, বরং দেওয়ার জন্য। কেবল মানসিক দারিদ্র্যের কারণে অন্য মন্ত্রীরা সেই সুযোগটি নষ্ট করলেন।


ঈদের বিষয়টি আর একটু বলি। সাধারণত ঈদযাত্রায় ভোগান্তি বেশি হয় ঈদুল ফিতরের সময়। ঈদুল আজহায় সেটা কমই হয়। এবার কিন্তু সেটাও হয়েছে। ঈদের আগের দু-এক দিন প্রতিটি রাস্তাতেই ব্যাপক যানজট হয়েছে। আমার এক বন্ধু জানালেন, ঈদের আগের দিন তিনি ঢাকা থেকে পাবনার বেড়ায় গিয়েছেন। তাঁর সময় লেগেছে ১৮ ঘণ্টা! অথচ এই দূরত্ব যেতে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি লাগার কথা নয়। কেন এমনটি ঘটল? আমার ওই বন্ধু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, পুরো জটিলতাটিই তৈরি হয়েছে নিছক অব্যবস্থাপনার কারণে। পুলিশ যদি একটু সতর্ক হতো, তাহলে এই যানজট আর হয় না। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা কি বিষয়গুলো জানেন? খেয়াল করেছেন? যে রাস্তায় যানজট হয়েছে, সেই রাস্তাটুকু যে জেলায় পড়েছে, সেখানকার পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাকে যদি ওই কারণে বদলি করে দেওয়া হয়, তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, দেখবেন এর পরে আর কখনো সেখানে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। সব জায়গায় যাওয়ার দরকার নেই, মন্ত্রী নিজে আচমকা দু-এক জায়গায় যেতে পারতেন, দেখতেন তাহলেই খবর হয়ে যেত। গিয়েছেন তাঁরা? অথচ তাঁদের প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ঠিকই গেছেন। তাঁরা দেখেও শিখতে পারছেন না।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও