সংকট মোকাবিলায় ভুল পথ : অনলাইন ক্লাস কি সমাধান?

জাগো নিউজ ২৪ হাসান হামিদ প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০৬

জ্বালানি সংকটের মতো একটি বাস্তব ও তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে যদি আমরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আবারও পরীক্ষাগারে পরিণত করি, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে স্কুলগুলোতে সপ্তাহে কয়েকদিন অনলাইন ক্লাস চালুর প্রস্তাব যে বিতর্ক তৈরি করেছে, তা কেবল একটি নীতিগত মতভেদ নয়; বরং এটি আমাদের শিক্ষা বাস্তবতার গভীর সংকট ও সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। সরকারের যুক্তি সহজ: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, যানজট এবং নগরজীবনের চাপ কমাতে ‘ব্লেন্ডেড’ বা মিশ্র শিক্ষাপদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। কাগজে-কলমে এটি আধুনিক ও সময়োপযোগী একটি ধারণা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষার যে অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে আমরা অর্জন করেছি, তা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। বরং সেই অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে দেয়, একই পথে আবার হাঁটা মানে পূর্বের ভুলগুলোকে পুনরাবৃত্তি করা।


করোনাভাইরাস মহামারির সময় বাধ্য হয়ে অনলাইন শিক্ষায় ঝুঁকতে হয়েছিল। তখন এটি ছিল বিকল্পহীন একটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সময়ের শিক্ষা ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের মনোযোগের অভাব, মূল্যায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য এসব বিষয় এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। শহরের কিছু সচ্ছল পরিবার হয়তো এই ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল, কিন্তু বৃহত্তর শিক্ষার্থী সমাজ এর বাইরে থেকে গেছে। ফলে অনলাইন শিক্ষা একটি সমাধান নয়, বরং নতুন এক বৈষম্যের জন্ম দিয়েছিল। আজ যখন আবার সেই অনলাইন ক্লাস চালুর প্রস্তাব উঠছে, তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সেই অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা নিয়েছি? নাকি জ্বালানি সংকটের অজুহাতে আমরা আবারও সহজ কিন্তু অকার্যকর পথ বেছে নিতে চাইছি?


আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কেবল তথ্য আদান-প্রদানের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি সামাজিক ও মানবিক অভিজ্ঞতা। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি যোগাযোগ, সহপাঠীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া, শৃঙ্খলা ও সামাজিক আচরণের চর্চা- এসবের কোনো বিকল্প অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দিতে পারে না। বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা এখনও আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বনির্ভরতার সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যেখানে অনলাইন ক্লাস তাদের জন্য কার্যকর হতে পারে। এর পাশাপাশি রয়েছে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এখনো দেশের অনেক পরিবারে একটি স্মার্টফোনই ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সেটিও অভিভাবকের কর্মস্থলে ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেট সংযোগের মান এবং খরচ; দুটিই বড় বাধা। এই অবস্থায় অনলাইন ক্লাস চালু করা মানে একটি বড় অংশের শিক্ষার্থীকে কার্যত শিক্ষার বাইরে ঠেলে দেওয়া।


অভিভাবকদের একটি বড় উদ্বেগ হলো শিশুদের ডিভাইস নির্ভরতা। ইতোমধ্যেই মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি একটি সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের নামে যদি আবার শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পড়াশোনার চেয়ে বিনোদনমূলক কনটেন্টের প্রতি ঝোঁক বাড়বে- এটি খুবই স্বাভাবিক একটি প্রবণতা। অন্যদিকে শিক্ষকদের প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন শিক্ষাদান একটি আলাদা দক্ষতা, যা সবার মধ্যে সমানভাবে নেই। অনেক শিক্ষকই এখনো এই পদ্ধতিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। ফলে পাঠদান কার্যকর হওয়ার বদলে তা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থাকে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি সরাসরি, জ্বালানি সংকট মোকাবেলার জন্য কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা উচিত? এর বিকল্প কি নেই?


বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে ক্লাসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা। স্কুলগুলোতে ক্লাসের সময় কমিয়ে আনা যেতে পারে, প্রয়োজনে শিফট ভিত্তিক ক্লাস চালু করা যেতে পারে। সকালে বা বিকেলে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সশরীরে ক্লাস নেওয়া হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে। এছাড়া সপ্তাহে ছুটির দিন কমিয়ে বা পুনর্বিন্যাস করে ক্লাসের সময়সূচি এমনভাবে সাজানো যেতে পারে, যাতে কম সময়ে কার্যকরভাবে পাঠদান সম্পন্ন হয়। পাঠ্যসূচি পুনর্বিন্যাস করে অপ্রয়োজনীয় চাপ কমানো যেতে পারে। এতে করে শিক্ষার্থীরা কম সময়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে পারবে। যানজট কমানোর জন্য স্কুল সময়সূচি বিভিন্ন এলাকায় ভিন্নভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। সব স্কুল একই সময়ে শুরু ও শেষ হলে যে চাপ তৈরি হয়, তা কমানো সম্ভব। এটি জ্বালানি সাশ্রয়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিনির্ধারণে বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষার্থীদের মতামত বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একতরফা সিদ্ধান্ত কখনোই কার্যকর হয় না, বিশেষ করে শিক্ষার মতো সংবেদনশীল খাতে। জ্বালানি সংকট একটি সাময়িক সমস্যা হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি। আজকের একটি ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তড়িঘড়ি করে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের দিকে না গিয়ে, আমাদের উচিত বাস্তবভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও