যুদ্ধ বন্ধ হলেও আমরা জ্বালানি সংকট থেকে মুক্ত হব না: অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম

www.ajkerpatrika.com এম শামসুল আলম প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:০৮

অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন। তিনি কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি টেকনোলজির পরিচালক ছিলেন। তিনি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর পিএইচডি করেছেন। সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের কারণ এবং এ থেকে সমাধান পেতে করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার সঙ্গে।


ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়। কিন্তু সরকার এ সংকট স্বীকার করেনি। গত ২৪ মার্চ জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। মন্ত্রীর এ কথার যৌক্তিকতা কতটুকু?


এম শামসুল আলম: মন্ত্রীর কথাকে যদি ইতিবাচকভাবে দেখি, তাহলে স্বাভাবিক চাহিদার বিপরীতে যে পরিমাণ তেল বাজারে থাকার কথা, সেই পরিমাণ তেল বাজারে আছে। কিন্তু চাহিদা সংকটের কারণে বেড়ে গেছে। এই সংকটের সময়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বা সংশয় তৈরি হয়েছে। সে কারণে মানুষ অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করা, বেশি করে জ্বালানি ক্রয় করার চেষ্টা করছে। যখনই চাহিদা বেড়ে যায় সরবরাহের তুলনায়, তখন সংগত কারণেই কালোবাজারি, অসাধু ব্যবসায়ী তৈরি হয়। সে কারণে এখন দেশে জ্বালানি নিয়ে কালোবাজারি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দাপট দেখা যাচ্ছে। এখন যেনতেনভাবে মূল সাপ্লাই চেইন ব্রেক করে কালোবাজারিদের নিয়ন্ত্রণে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।


সরকার প্রবর্তিত স্বচ্ছ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এখন সংকটে পড়েছে। এ কারণে এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। যখন আট ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ট্রাকচালক তেল না পেয়ে পাম্পের একজনকে হত্যা করে, তখন সংকটের তীব্রতা মানুষকে অস্বাভাবিক করে তোলে। এই ঘটনা হলো তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। মন্ত্রীর কথা এই প্রেক্ষাপটে ঠিক না। সংকটকে এভাবে সুনির্দিষ্ট করা যায় না। যে কারণে তাঁর এই ব্যাখ্যাটা যৌক্তিক হয়নি বরং বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নির্ভরশীলতা আমাদের কতটা ঝুঁকিতে ফেলছে বা ফেলতে পারে?


এম শামসুল আলম: অবশ্যই ফেলছে। পৃথিবীর সিংহভাগ জ্বালানি সরবরাহ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আর বাংলাদেশও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপরই নির্ভরশীল। ইউরোপের দেশগুলোয় রাশিয়া থেকে জ্বালানি আসে। আমাদের দেশে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আসে না। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যে যদি সমস্যার সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব তো সারা বিশ্বেই পড়বে। এ কারণে আমরাও সমস্যার মধ্যে পড়েছি।

আমাদের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের যে অবস্থা, তাতে বর্ধিত মূল্যে জ্বালানি কেনা আমাদের অর্থনীতির জন্য কতটা সংকটের সৃষ্টি করতে পারে?


এম শামসুল আলম: বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য স্বাভাবিক দামে স্থির ছিল। তারপরেও সেই মূল্যে আমরা জ্বালানি আমদানি করতে পারিনি, শুধু আমাদের সক্ষমতা না থাকার কারণে। আমাদের চাহিদা অনুযায়ী যতটুকু জ্বালানি আমদানি করা দরকার, ততটা জ্বালানি আমরা আনতে পারিনি। তা ছাড়া এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) নির্ভর হওয়ার কারণে আমাদের জ্বালানিনিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে গেছে। যতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা দরকার, ততটুকু উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার আমরা যে দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছি, সেই দামে ভোক্তাদের দেওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে ভর্তুকি দিতে হয়েছে। যদিও বিগত সরকার দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি করেছে। এটা হলো একটা ন্যারেটিভ।


অন্য একটা ন্যারেটিভ হলো, আমরা জ্বালানি সরবরাহের কৌশলগত জায়গা থেকে বেসরকারীকরণ করার মাধ্যমে এ খাতটিকে একটা লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করেছি। লুণ্ঠন করার জন্য ন্যায্য ও যুক্তির দাম উপেক্ষা করে ৫০ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। জনগণের কাছ থেকে ট্যারিফ (এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য আমদানির সময় সরকার কর্তৃক আরোপিত কর) বৃদ্ধির নাম করে শতভাগ দাম বাড়িয়ে অর্থ তছরুপ করা হয়েছে। এভাবে লুণ্ঠন করে জনগণের টাকা ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢোকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর অসাধু ব্যবসায়ীদের পকেট থেকে সেটা বিভিন্নজনকে বিতরণ করা হয়েছে। এ খাতের বড় বড় কর্মকর্তা ও কর্মচারী অলিগার্ক (সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী) হয়ে গেছেন লুণ্ঠনের ক্ষেত্র প্রস্তুতিতে। তাঁরা লুণ্ঠন করার জন্য বিশেষ গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। তাঁরা সুবিধা পেয়েছেন। বিগত সময়ের রাজনৈতিক নেতারা কাজ করেছেন এ অবস্থা তৈরি করার জন্য। এভাবে একটা কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে লুণ্ঠনের একটা স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত করা হয়েছে জ্বালানি খাতকে। এই ন্যারেটিভটা এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না, গুরুত্ব পাচ্ছে না এবং সরকারও সেদিকে নজর দিচ্ছে না। এটাই হলো সমস্যার মূল জায়গা। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা জ্বালানি সংকট থেকে মুক্ত হব, তা ভাবার সুযোগ নেই।


জনগণ এই ন্যারেটিভটা না জানার কারণ কী?


এম শামসুল আলম: প্রথম কারণ হলো, এই তথ্যগুলো সামগ্রিকভাবে সামনে আসেনি এবং আসতে দেওয়া হয়নি। আজকে জ্বালানি সংকটের জন্য ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ করা হচ্ছে। আসলে তো যুদ্ধ সংকট তৈরি করেনি। তবে সংকটের কিছুটা মাত্রা বাড়িয়েছে। কিন্তু এ সংকট তৈরি করেছে বিগত সরকারগুলো লুণ্ঠনমুখী জ্বালানি খাত উন্নয়ন এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার নাম করে।


তাহলে বিগত সরকারের ভূমিকা কী ছিল?


এম শামসুল আলম: দেশের বিগত শাসকগোষ্ঠী এ খাতে লুণ্ঠনমুখী উন্নয়ন এবং লুণ্ঠনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য কাজ করেছে। ফলে জ্বালানির ব্যয় বেড়েছে। সে ব্যয় সংকুলান করার সামর্থ্য কি সরকারের ছিল না? ভর্তুকির নাম করে সরকারের কাছ থেকে অর্থ গেছে। কোথাও ঘাটতি তৈরি করা হয়েছে, কোথাও যা দাম তার চেয়ে বেশি ব্যয় করা হয়েছে। আবার সেই অর্থ জোগান দেওয়ার জন্য ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণের কাছ থেকে অর্থ লোপাট করা হয়েছে। সেভাবে অর্থ নেওয়ার প্রক্রিয়া ১৬-১৭ বছর ধরে অব্যাহত ছিল। এসব কাজ করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা ব্যবহার করে। অর্থাৎ সরকার নামক প্রতিষ্ঠানই এসব অপকর্ম করেছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও