অতীত অভিজ্ঞতার কারণে সংস্কার নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে

প্রথম আলো আসিফ নজরুল প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:০৪

ড. আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক। সাউথ এশিয়ান ফর হিউম্যান রাইটসের নির্বাচিত ব্যুরো মেম্বার ছিলেন। তিনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশ নিয়ে বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, সংস্কার ইত্যাদি প্রসঙ্গে।


অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত অধ্যাদেশগুলো সম্পর্কে সরকারি দলের সিদ্ধান্ত আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন। সরকারি দল অনেকগুলো অধ্যাদেশ গ্রহণ করলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল বা এখনই গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাবেক আইন উপদেষ্টা হিসেবে আপনি এসব আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আপনার প্রতিক্রিয়া কী?


আসিফ নজরুল: বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই কিছু হতাশা বা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে; কিন্তু এটাকে একপক্ষীয়ভাবে দেখতে চাই না। এর ইতিবাচক দিকও আছে, সেটি আগে বলি।  সংসদের বিশেষ কমিটি যেসব আইন হুবহু গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি, আইনগত সহায়তা, সাইবার সুরক্ষা বা ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা–সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাস্তবিক অর্থে নাগরিকদের সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ বাড়াবে। এ ছাড়া জুলাই-সংক্রান্ত কয়েকটি আইন, যেমন জুলাই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা, শহীদ ও যোদ্ধা পরিবারের কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন এবং দায়মুক্তির বিধান—এসব রাখা হয়েছে। এগুলো শুধু আইন নয়, একটি ঐতিহাসিক অর্জন ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি। পরিবেশ–সংক্রান্ত আইনগুলোও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা প্রশংসনীয়।


তবে সমস্যা হলো, এই ইতিবাচক আইনগুলোই যথেষ্ট নয়। যে ত্যাগ, যে প্রাণহানি, যে গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আরও গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার প্রত্যাশিত ছিল। সেগুলো আপাতত করা হচ্ছে না। সরকার বলছে, কিছু আইন সংশোধন করে আবার আনা হবে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এগুলো শুধু আশ্বাস পর্যায়ে থেকে যায়। তাই পুরোপুরি স্বস্তিতে থাকার সুযোগ নেই।


এসব অধ্যাদেশের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ও জুলাই সনদে বিএনপি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এখন তাদের ভিন্ন অবস্থানের কারণ কী বলে মনে করেন? আপনাদের প্রণীত অধ্যাদেশে কোনো সমস্যা ছিল কি?


আসিফ নজরুল: বিচারক নিয়োগ–সংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল নিয়ে কিছু বিতর্ক ছিল, সেটি অস্বীকার করছি না। সংবিধানে যেখানে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শের কথা বলা হয়েছে, সেখানে কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে আইনগত প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু এর যৌক্তিকতা আইনটির প্রস্তাবনায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তারপরও এগুলো সংশোধনযোগ্য বিষয়, এ জন্য পুরো আইন বাতিল করা ঠিক হয়নি।


সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল হওয়াটা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে হতাশ করেছে। এটি দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, এমনকি ২০২৪ সালের আদালতের রায়েও এটার নির্দেশনা রয়েছে। ইতিমধ্যে এই আইনের অধীনে কিছু কাঠামোগত অগ্রগতি হয়েছে। জনবল নিয়োগ, বাজেট প্রস্তুতি, আলাদা কার্যালয় তৈরি—এসব প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল।


কারও কারও আপত্তি ছিল অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরিভাবে সুপ্রিম কোর্টে হস্তান্তর নিয়ে। কিন্তু আমরা তো তাৎক্ষণিকভাবে তা দিইনি। বলেছিলাম, সচিবালয় পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে ধাপে ধাপে হবে। ফলে এ রকম কোনো অজুহাতে পুরো আইন বাতিল করা হলে তা হতাশাজনক। তবে আমি এখনো আশা ছাড়তে চাই না। এখনই গ্রহণ না করা হলেও, এই আইনগুলো অদূর ভবিষ্যতে প্রণয়ন করার সুযোগ থাকবে। সরকারের উচিত, বিরোধী দলের চাপে বা জনগণের সমালোচনার মুখে নয়, নিজের উপলব্ধি থেকেই এমন উদ্যোগ নেওয়া।


অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মানবাধিকার কমিশন আইন সংশোধন ও গুম প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। অন্যদিকে গুম কনভেনশনে পক্ষরাষ্ট্র হওয়ার কারণে গুম প্রতিরোধে আইন করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। মানবাধিকার আইন ও গুম প্রতিরোধ আইন এখনই গ্রহণ না করাকে আপনি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন?


আসিফ নজরুল: এ দুটি আইন প্রণয়নের জন্য আমরা অনেক কষ্ট করেছিলাম। অন্য সব বিষয়ে সমালোচনামুখর দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন ও অ্যাকটিভিস্টরা ও মানবাধিকারকর্মীরাও আইন দুটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছিলেন। এ ছাড়া নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের অপশনাল প্রটোকল অনুযায়ী একটি জাতীয় প্রতিরোধব্যবস্থা গঠনের বিষয়টি মানবাধিকার আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটার আগেই প্রতিরোধ করা যায়। গুম আইনটিও এ–সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির পক্ষরাষ্ট্র হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়েছিল। ফলে এসব আইন শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা নয়, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এগুলো উপেক্ষা করা হলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা থেকে যাবে।


তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব আইন পুরোপুরি বাতিল করা বর্তমান সরকারের পক্ষে হয়তো সহজ হবে না। বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মী অতীতে গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গুম প্রতিরোধ আইন না হলে মায়ের ডাকের সানজিদা কিংবা গুমের শিকার ইলিয়াস আলীর পরিবারগুলোকে কী উত্তর দেবে বিএনপি। এসব স্মরণ রেখে বিএনপি বরং অচিরেই আমাদের আমলের চেয়ে শক্তিশালীভাবে এসব আইন প্রণয়ন করবে বলে আশা করি।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও