সংসদ কি আমির হামজার লাগাম টানবে?
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি ওয়াজ মাহফিলে ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানার সৌন্দর্যের বর্ণনা করে কঠোর সমালোচনার মুখে ক্ষমা চেয়েছিলেন ইসলামি বক্তা মুফতি আমির হামজা। তখন তিনি ফেইসবুকে দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করে লিখেছিলেন: “আমি স্বীকার করছি মানসিকভাবে আমি পুরোপুরি সুস্থ না। শারীরিক ও মানসিক কোনোদিক দিয়েই আমি ফিট না।” তিনি ভক্তদের অনুরোধ করেছিলেন, তার ভুলভ্রান্তিগুলো দিয়ে যাতে বিচার করা না হয়। তিনি কথা দেন, পরবর্তী বছরগুলোতে পরিপূর্ণ প্রস্তুতি এবং যথাযথ চিকিৎসা নিয়ে তাফসির মাহফিলে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি কথা রেখেছেন কিনা আমাদের জানা নেই। তবে রাশমিকার বিয়ের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে মানুষ জানিয়ে দিয়েছে তারা আমির হামজার সেই সৌন্দর্য বর্ণনা বিস্মৃত হননি।
ওই ঘটনার বছরখানেকে পরে গত বছরের সেপ্টেম্বরে একটি ওয়াজ মাহফিলে আমির হামজা দাবি করেন, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি দেখেছেন, সকালবেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের শিক্ষার্থীরা মদ দিয়ে কুলি করছেন। তার এ বক্তব্যের একটি অংশ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। যেখানে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, “১৬ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হলে আজান দিতে দেওয়া হয়নি।” এই বক্তব্য নিয়েও তীব্র সমালোচনা শুরু হলে আমির হামজা দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নাম বলতে গিয়ে তিনি মুহসিন হলের নাম বলে ফেলেছেন। মুখ ফসকে গেছে। এ জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় রীতিমতন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আমির হামজার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিল। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমির হামজা নামের একজন বক্তার বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় কতৃর্পক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আমির হামজা তার বক্তব্যে দাবি করেছেন, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন এবং আবাসিক হলে সকালে ‘মদ’ দিয়ে কুলি করতে দেখেছেন। তিনি আরও বলেছেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শিক্ষকদের লাঠি দিয়ে পেটায়। প্রকৃতপক্ষে তার কোনো বক্তব্যই সত্য নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১১ সালে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ চালু হয়। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে এই বিভাগে প্রথম শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। সুতরাং আমির হামজা জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হওয়ার যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা সত্য নয়।
ওই সময় আমির হামজাকে তার দল থেকে সতর্ক করে দেওয়া হলে তিনি বলেন, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কোরানের তাফসিরের বাইরে আর কিছু বলব না। কোনো বিষয়ে তুলনা করে কথা বলতে গেলেই প্যাঁচ লেগে যায়। আমি আর এসবের মধ্যে নেই।”
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এই আমির হামজা কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছেন। সম্প্রতি একটি ওয়াজ মাহফিলে খোদ জাতীয় সংসদের নারী এমপিদের নিয়ে তার বক্তব্যের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়: “রুমিন ফারহানা আপা আছে। এরপর এই যে মন্ত্রী পটলের মেয়ে আছে, ফারজানা শারমিন। আমার বামে, ডাইনে এমন এমন বডিআলা লোক পেয়েছি। এগুলোতো সিরিয়াল করা থাকে আগের থেকে। কে কোথায় বসবে আমরা জানিও না। আল্লাহর ইশারা, ভেতরে গিয়ে দেখি আমার ডানে বামে শুধু ভুড়িওয়ালা। এমন এমন বড় বড় ভুড়ি, আমার মনে হয় ভুড়ি ছিঁড়লে এর ভেতর থেকে ব্রিজ কালভার্ট এগুলো বের হবে। মহিলারা ওদের দেখলে লজ্জা পাবে। রুমিন ফারহানা আপা আছে...আপারা আমার সামনে। আমার মাঝেমাঝে চিন্তা হয়, হায় আল্লাহ আমার ডানে বামে যে অবস্থা, ম্যাডামগুলো যদি ওদের পেটের দিকে তাকায়, ভাববে আল্লাহ–ছেলেমেয়ে হয় আমাদের, আর পেট হয় হুজুরের পাশের দুইজনের। কি বডি (এটা বলেছেন খুবই বিকৃত ভঙ্গিতে, তখন বাকিরা হেসে উঠেছেন)! উকুন মারা যাবে বডির ওপরে।”
প্রশ্ন হলো, কোরানের কোনো আয়াত বা কোনো হাদিস প্রকাশ্যে এই ধরনের বক্তব্য দেওয়াকে কি সমর্থন করে? তাও ইসলামিক আলোচনায়? চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা রাজনীতির মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়া আর হাজার হাজার মানুষের সামনে ইসলামের বয়ান কি এক জিনিস? একজন ইসলামিক স্কলার, যিনি আবার সংসদ সদস্যও, কি এই ভাষায় কথা বলতে পারেন? তিনি হয়তো দাবি করবেন, নারীদের নিয়ে কোনো কটাক্ষ করেননি। কিন্তু নারী বা পুরুষ কাউকে বডিং শেইমিং করার অধিকার কি তার আছে?
সম্প্রতি আমির হামজা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা আব্বাসের অসুস্থতা নিয়েও ঠাট্টা করে সমালোচিত হয়েছেন। কাছাকাছি সময়ে তিনি জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ‘আপাদমস্তক নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী’ বলেও মন্তব্য করেন। ২৭ মার্চ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর বড় মসজিদে জুমার নামাজের আগে এক আলোচনায় আমির হামজা বলেন, “জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু নাস্তিক এবং ইসলামবিদ্বেষী। তিনি জামায়াতে ইসলামী কিংবা চরমনাই বিদ্বেষী নন, তিনি ইসলামবিদ্বেষী।” তার এই বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে আমির হামজাকে নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে মানহানির একাধিক মামলাও হয়েছে।