পরিকল্পনাহীন বসতি গ্রামবাংলায় ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
বাংলাদেশের গ্রাম একসময় ছিল প্রকৃতিনির্ভর এক সুষম জীবনের প্রতিচ্ছবি-যেখানে কৃষি, পানি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকত। কিন্তু সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পরিকল্পনাহীন বসতি বিস্তার, নির্বিচারে কৃষিজমি ধ্বংস, খাল-নালা ভরাট এবং পুকুরে অপরিকল্পিত পন্থায় মৎস্য চাষ-সব মিলে গ্রামবাংলা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষ্মীপুর জেলা এ সংকটের একটি বাস্তব উদাহরণ হলেও এটি কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়; বরং দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে একই পরিস্থিতি বিরাজমান।
লক্ষ্মীপুর জেলার লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলা-প্রতিটি এলাকায় একই ধরনের বিপজ্জনক প্রবণতা স্পষ্ট। ইউনিয়ন পর্যায়ে গেলেও দেখা যায়, কৃষিজমি আর কৃষির জন্য সংরক্ষিত থাকছে না; বরং তা দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে বসতভিটায়। পরিবারভিত্তিক জমি বণ্টনের ফলে উর্বর জমি ৫-১০ কাঠার খণ্ডে ভেঙে ফেলা হচ্ছে এবং সেই জমিতেই গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত বসতি।
এ প্রক্রিয়া শুধু জমির আকার কমাচ্ছে না, বরং কৃষির ভিত্তিকেই ধ্বংস করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ শতাংশ হারে আবাদি জমি কমছে। স্বাধীনতার পর যেখানে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ০.১৭৪ একর, সেখানে বর্তমানে তা কমে ০.০৫ একরের নিচে নেমে এসেছে। এটি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বিপদ সংকেত।
বিশ্ব পরিসরেও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা FAO বহুবার সতর্ক করে বলেছে, দ্রুত নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশ সেই ঝুঁকির সম্মুখসারিতে অবস্থান করছে।
কৃষিজমি ধ্বংসের পাশাপাশি আরেকটি মারাত্মক সংকট হলো-খাল-নালা ও প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট। একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়ির পাশে খাল, নালা বা ডোবা ছিল-যা প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি করত এবং একইসঙ্গে জীববৈচিত্র্যের ধারক ছিল। এ জলাধারগুলোতে দেশীয় মাছ ও জলজপ্রাণীর বসবাস ছিল, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করত।
কিন্তু বর্তমানে এ খাল-নালা ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে বাড়ি, দোকান, এমনকি স্থায়ী স্থাপনা। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে বন্যার পর দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় বৃষ্টির পানি দিনের পর দিন জমে থাকে, যা কৃষি, অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, দেশের বহু খাল-নালা দখল ও ভরাটের কারণে তাদের পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। এ তথ্য প্রমাণ করে, আমরা নিজেরাই আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করছি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- কৃষি জমি
- বসতি স্থাপন
- অপরিকল্পিত