পরিস্থিতি কীভাবে এমন হয়েছে যে, ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর মতো হঠকারিতার কথা ভাবছেন ট্রাম্প?
ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ইরান যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন। এখন পরিস্থিতি এমন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ তার হাতের বাইরে চলে গেছে এবং তিনি সারাবিশ্বে কোণঠাসা। এই অবস্থায় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অপমান এড়াতে তিনি ইরানে স্থল আক্রমণের মতো চরম পদক্ষেপ নিতে পারেন—এমন শঙ্কা ক্রমশ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
নিজের স্বার্থেই ট্রাম্প বাড়াবাড়ির পথে হাঁটছেন। এই আচরণ ট্রাম্প ও আমেরিকা উভয়ের জন্য বিধ্বংসী হবে, তা যতই সীমিত সময় ধরে এবং ছোট পরিসরেই ঘটুক। বিগত দিনের মার্কিন অভিজ্ঞতাই তার সাক্ষ্য।
আসল কথা হলো, ইরান যুদ্ধের জটিল ফাঁদে ট্রাম্প বন্দি হয়ে পড়েছেন। কূটকৌশলের নামে যে জাল তিনি বিছিয়েছিলেন, সেই জালে জড়িয়ে পড়ে এখন নিজেরই দিশেহারা অবস্থা। এই উভয়সংকটে থেকে বের হওয়ার সহজ পথ খোলা নেই তার সামনে। তিনি যে সংকটে ডুবে আছেন, সেটি হলো হরমুজ প্রণালি।
এই একই প্রেসিডেন্ট, যে নিজের এক ভূতুড়ে কাল্পনিক জগৎ তৈরি করেছেন। তিনি সেখানে বারবার দাবি করছেন, যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছেন, ইরান শান্তি চায় এবং আলোচনা ঝড়োগতিতে এগোচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই উল্টো কথা বলে, ইরান সব ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েল এখনও বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ, আর ইয়েমেনি হুতিরা যুদ্ধে যোগ দিয়ে লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ বন্ধের উপক্রম করছে।
প্রকৃত অর্থে সমঝোতার ছিটেফোঁটাও দৃশ্যমান নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কোনো দেশই একচুল ছাড় দিতে রাজি নয়। গত মাসে, নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ট্রাম্প কূটনীতির পথ ছাড়ার আগে ইরানের সঙ্গে যে স্পষ্ট দূরত্ব ছিল, এখন তা আরও গভীর। সামনের দিনগুলোতে ট্রাম্প অবশ্যই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার বিপুল ফারাক টের পাবেন। সেই পরিস্থিতিতে তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ বৃদ্ধি করে স্থল হামলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ঘটনা কীভাবে এত দূর গড়াল, ভাবলেই অবিশ্বাস্য লাগে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যরা মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা সইয়েছে। তবুও একজন প্রেসিডেন্ট আবার মধ্যপ্রাচ্যে সৈন্য পাঠানোর কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন। আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রেসিডেন্ট হলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। যিনি কোনো একদা বিলাসী বৈদেশিক যুদ্ধের তুখোড় সমালোচক ছিলেন। তবে এই সিদ্ধান্ত কোনো দৈব বা আকস্মিক ঘটনা নয়; সুচিন্তিত নীতির প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে স্থল আক্রমণ শুরু করে, তার সম্পূর্ণ দায় বর্তাবে ট্রাম্পের ওপর। তখন তিনি নিশ্চিতভাবেই অন্যদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করবেন, আর সেই নিশানায় থাকবে পেন্টাগনের বাতিকগ্রস্ত ও কমিক বইয়ের যুদ্ধবাজ নেতা পিট হেগসেথ।
বাস্তবে যা ঘটছে, হোয়াইট হাউস তা ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষা করে যাচ্ছে। কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে তারা সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের কাছে ব্যর্থতা আড়ালের প্রধান উপায় সত্যকে অস্বীকার করা। তিনি দাবি করেছেন, ইরানি নেতাদের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ইরানে রেজিম পরিবর্তনের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে। তার এক অদ্ভুত অভ্যাস আছে, প্রথমে তিনি ঘটনা ঘটান, তারপর নিজেকে সেই ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখেন এবং সবশেষে দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। যেন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, উপসাগরীয় মিত্রদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা—এসব কিছুর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ঠিক তেমনি, বিমান হামলার মুখেও ইরানের অনমনীয় প্রতিরোধ এবং তেহরানে প্রত্যাশিত গণঅভ্যুত্থানের অনুপস্থিতির সঙ্গেও যেন তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
তিনি বুঝতেই পারছেন না, ইরান একটি অসম যুদ্ধ লড়ছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বোমাও ইরানের গর্ব, আদর্শ, বিশ্বাস ও ইতিহাসকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারবে না।
বিশ্ব থেকে ট্রাম্প ক্রমশ বিচ্ছিন্ন ও একা হয়ে পড়ছেন। তার ধনী আরব ব্যবসায়ী বন্ধুরাও আর তাকে বিশ্বাস করছে না। উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলো প্রতিরক্ষার বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যাটোর সহায়তা চেয়েছিলেন, ইউরোপের উত্তর ছিল, আমরা আপনাকে জানাব। ইরানের কুর্দিরাও তার মতো মানুষের আশ্বাসে প্রাণ বিসর্জন দিতে রাজি নয়। মার্কিন জনগণ ও মাগা ডানপন্থীদের যুদ্ধসমর্থন আগে থেকেই দুর্বল ছিল; এখন তা মরীচিকার মতো উধাও।
ট্রাম্পকে নেতানিয়াহু ইরান যুদ্ধে উসকে ছিলেন, এখন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কথামতো হামলা বন্ধ করতে রাজি নন। বেচারা ট্রাম্প! ইসরায়েলের তৈরি করা ইরান বিজয়ের গালগল্পতে বিশ্বাস এনেছিলেন; অথচ তা ছিল নিছক গালগল্প।
ফলে ইরানের জীবিত থাকা কট্টরপন্থী নেতারা যুদ্ধ জয়ের গন্ধ পাচ্ছেন এবং তাদের কঠোর অবস্থান দিন দিন আরও কঠোর করছেন।