অস্তরাগের বেদনা ছাড়িয়ে অনন্ত প্রাণের পথে পুনর্যাত্রা
মানুষের জীবন এক বিচিত্র প্রবাহ। এখানে রোদ আছে, ছায়া আছে; আছে মিলনের মাধুর্য আর বিচ্ছেদের হাহাকার। সম্প্রতি আমার ব্যক্তিগত আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়েছে—আমার সহধর্মিণী পরলোকগমন করেছেন। দীর্ঘ বছরের পথচলায় যিনি ছিলেন আমার সুখ-দুঃখের ভাগীদার, যার উপস্থিতিতে ঘর ছিল এক জীবন্ত নন্দনকানন, আজ সেখানে কেবলই নিস্তব্ধতা। এই শূন্যতা কোনো জাগতিক প্রাপ্তি দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, জীবনটা হয়তো এখানেই থমকে গেল। কিন্তু শোকের সেই অতল অন্ধকারে ডুবে থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিরন্তন সুরটি কানে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল:
“আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। / তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥”
রবির এই দর্শন এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে আনে। তিনি আমাদের শেখান যে, দুঃখ এবং মৃত্যু জীবনের শেষ কথা নয়। এগুলো জীবনেরই একেকটি অপরিহার্য অংশ। যে প্রিয়জন চলে গেছেন, তার শারীরিক অনুপস্থিতি আমাদের ব্যথিত করে ঠিকই, কিন্তু তার অস্তিত্ব কি কেবল সেই রক্ত-মাংসের শরীরেই সীমাবদ্ধ ছিল? মোটেও না। তিনি মিশে আছেন আমার প্রতিদিনের অভ্যাসে, আমার চিন্তায়, এবং আমাদের গড়ে তোলা সংসারের প্রতিটি ধূলিকণায়।
দুই.
প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম ও জীবনের গতি
কবির ভাষায়— “তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা, / বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে ॥”
প্রিয়জন হারানো মানুষের কাছে প্রথম দিকে মনে হয় পৃথিবীটা কতই না নিষ্ঠুর! আমার ঘর অন্ধকার, অথচ বাইরে সূর্য হাসছে, পাখিরা গাইছে, ঋতু বদলাচ্ছে। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে এটাই জীবনের পরম সত্য এবং সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।
প্রকৃতি আমাদের শেখায় যে, কোনো ব্যক্তিবিশেষের মহাপ্রস্থানে মহাজাগতিক উৎসব থেমে থাকে না। জীবন এক ‘নিত্যধারা’ বা ‘চিরন্তন প্রবাহ’। এক তরঙ্গ মিলিয়ে গেলে যেমন আরেক তরঙ্গের উদ্ভব হয়, তেমনি এক প্রাণের অবসানে অন্য প্রাণের স্পন্দন জারি থাকে। আমার স্ত্রীর চলে যাওয়াটা হয়তো আমার ব্যক্তিগত জগতের এক বড় ক্ষয়, কিন্তু মহাবিশ্বের বৃহত্তর ক্যানভাসে তা এক অনন্ত যাত্রার শুরু।
তিন.
শোককে শক্তিতে রূপান্তর
অনেকে মনে করেন, প্রিয়জনকে হারানোর পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা মানে তাকে ভুলে যাওয়া। আসলে বিষয়টি উল্টো। তাকে মনে রাখার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো তার গুণাবলিকে নিজের জীবনে ধারণ করা। আমার স্ত্রী যেভাবে সংসার আগলে রাখতেন, যেভাবে প্রতিকূলতায় ধৈর্য ধরতেন—সেই ধৈর্য আর সাহসকে এখন আমার নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। তিনি আমাকে যেভাবে দেখতে চাইতেন, সেই ‘আমি’ হয়ে ওঠাই হবে তার প্রতি আমার শ্রেষ্ঠ তর্পণ।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— “কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।”
ঝরা ফুলের জন্য শোক করে বসন্তকে থামিয়ে রাখা যায় না। বরং ঝরা ফুলের সার থেকেই নতুন কুসুমের জন্ম হয়। আমাদের জীবনের দুঃখগুলোও তেমনি। এই যে বিরহদহন, এটি আমাদের মনকে পুড়িয়ে খাঁটি করে তোলে। মানুষের প্রতি সহানুভূতি বাড়ায়, জীবনকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তোলে। এই বেদনা থেকেই জন্ম নিতে পারে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার সংকল্প কিংবা সৃজনশীল কোনো কাজ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জীবন দর্শন