লিপি রাণীদের মাথার চুল খুলছে অর্থনীতির সম্ভাবনার দুয়ার

বিডি নিউজ ২৪ অলোক আচার্য প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ২১:০৭

মধ্যদুপুর থেকেই পাড়ায় পাড়ায় ভেসে আসে ফেরিওয়ালার কণ্ঠ—চুল আছে, চুল! তারপর চুল দিলে কী কী জিনিস পাওয়া যায়, তার একটা লম্বা ফিরিস্তি থাকে। এই সুর শুনলেই গ্রামের গৃহবধূরা সচকিত হয়ে ওঠেন। হাতের কাজ ফেলে ছুটে যান ফেরিওয়ালার কাছে। কারণ সবার ঘরেই মাথার চুল জমানো থাকে। ওই চুল দিয়ে পাওয়া যায় নানা রকম জিনিসপত্র; হাঁড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছু। এ দৃশ্য শুধু একটি গ্রামের নয়, বরং দেশের অনেক গ্রামেরই খুব পরিচিত চিত্র।


ফেরিওয়ালার কাছে চুল দিয়ে জিনিস কিনে হাসিমুখে ফেরা গৃহবধূ লিপি রাণী বলেন, অনেকদিন ধরে চুল জমিয়ে রেখেছিলাম একটা বড় ডেগ (পাতিল) নেওয়ার জন্য। আজ নিলাম। কিনতে গেলে তো অনেক টাকা লাগত। পরিবারের একাধিক নারী সদস্যের চুল জমিয়ে আরও বড় জিনিস কিনছেন অনেক নারী। এভাবেই নারীর মাথার চুল ধীরে ধীরে অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করছে। অনেকের জীবন ও জীবিকার নাটাই ধরে রেখেছে।


সময়ের সাথে সাথে নারীদের চুলের এই কেনাবেচা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে চুলের কারখানা। এসব কারখানায় হাজার হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ভাবতেই অবাক লাগে যে, নারীদের মাথার পরিত্যক্ত চুল দিয়ে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। এসব চুলের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠছে।


বাড়ি বাড়ি থেকে চুল সংগ্রহের পর সেগুলো বিক্রির জন্য গড়ে উঠছে পাইকারি আড়ত। সেখান থেকে চুল চলে যাচ্ছে কারখানায়। এ ব্যবসায় আগ্রহ বাড়ার মূল কারণ হলো এতে তেমন কোনো বিনিয়োগ লাগে না, ঝুঁকিও কম। খুব অল্প পুঁজি দিয়েই ঝুঁকিহীনভাবে শুরু করা যায়।


দেশের এ চুল এখন দেশীয় বাজার ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ থেকে চুল রপ্তানি হয় চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, জাপান ও কোরিয়ায়। এ চুল দিয়ে তৈরি হয় পরচুলা (উইগ)। ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চুলের চাহিদা বাড়ছে। ব্রেইড, হ্যালোইন, ক্লাউন, পনি ব্রেইড, রেগুলার নামের বিভিন্ন পরচুলা বিশ্বের প্রায় ৩৪টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।


মাথার চুল এখন নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। একটা সময় এই চুল অবহেলায় বাতিল হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো। কিন্তু প্রকৃতির কোনো কিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়, রূপ পাল্টে তা ব্যবহার্য হয়ে ওঠে। আধুনিককালে এটাই প্রমাণিত হয়েছে। সুযোগ, দক্ষতা ও সময় কাজে লাগিয়ে এ খাতেও বৈপ্লবিক গতি আনা সম্ভব। দেশের বেকার সমস্যার সমাধানে এই শিল্পে বেকার যুবক-যুবতীদের কাজে লাগানো যেতে পারে।


প্রায় তিন দশক আগে শুরু হওয়া এ অপ্রচলিত উদ্যোগ এখন রীতিমতো শিল্পে পরিণত হয়েছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, মানব চুলকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সারাদেশে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যার কেন্দ্রবিন্দু অন্তত ২৫টি কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি পণ্য শুধু দেশীয় চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বিশ্বব্যাপী আগ্রহেরও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি কিছু বিদেশি কারখানাও ইপিজেডে সরাসরি রপ্তানির কাজ করছে।


রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ছয় বছরে এই খাতে রপ্তানি আয় সাড়ে চার গুণ বেড়েছে।



  • ২০১৮-১৯ অর্থবছর: রপ্তানি আয় ছিল ৩.২৫ কোটি ডলার।

  • ২০২০-২১ অর্থবছর: আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৭১ কোটি ডলারে।

  • ২০২১-২২ অর্থবছর: আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০.৫০ কোটি ডলারে।

  • ২০২৫-২৬ অর্থবছর (প্রথম প্রান্তিক): জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ৩.৮৫ কোটি ডলারের চুল ও পরচুলা রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫৫% বেশি।


এই চুল বহির্বিশ্বে কেন এত দরকারি হয়ে উঠছে? একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ২০২১ সালের এক তথ্যমতে, চীনের প্রায় ২৫ কোটি মানুষ চুল পড়ার সমস্যায় ভুগছেন, যাদের বড় একটি অংশ তরুণ। তারা কৃত্রিম উপায়ে এই সমস্যা ঢাকতে পছন্দ করেন। গ্লোবাল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে চীনারা চুল পড়া চিকিৎসায় প্রায় ২৮৪ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার আরও ৬ থেকে ৭ গুণ বড় হবে। শুধু চীন নয়, সারা বিশ্বেই পরচুলার বিশাল বাজার রয়েছে। তবে এই বাজারে আমাদের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী হলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও