একুশের মূল্যবোধ
যে প্রজ্ঞা, যে সবল কাণ্ডজ্ঞান মানুষকে আত্মোপলব্ধি জাগাতে সাহায্য করে, মনুষ্যত্ববোধ জাগায় এবং সর্বোপরি এই জগৎ জীবনে তার আগমনের হেতু, এখানকার করণীয় বিষয় প্রভৃতি বোধ জাগায় তাই মূল্যবোধ। মানুষকে আত্মসচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করে মূল্যবোধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেকে বিদ্রোহী করে তোলে, পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়, কর্তব্যজ্ঞানে শ্রদ্ধাবোধ জাগায় এবং সর্বোপরি শ্রেয়বোধকে জাগ্রত করে মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ করে। মূল্যবোধই মানুষের আসল পরিচয়ের মাপকাঠি। মূল্যবোধহীনতায় মানুষের থাকে না কিছুই না তার নামগত বৈশিষ্ট (যেহেতু সে ‘মানুষ’) না তার প্রকৃত মর্যাদা।
এই মূল্যবোধ শুধু ব্যক্তির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যক্তি থেকে সমষ্টিগত ক্ষেত্রে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বস্তুত সমাজরে দশজনের মূল্যবোধের সমষ্টিই সামাজিক মূল্যবোধ। যেহেতু সমাজে বহুবিধ মূল্যবোধ থাকতে পারে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ভিন্ন মূল্যবোধের মধ্যে যে বিরোধ পরিলক্ষিত হয়, তা নিরসন হয় এক বাদানুবাদের মাঝ দিয়ে। আর এই দ্বন্দ্বের মাঝ দিয়ে সৃষ্ট হয় নতুন মূল্যবোধ। একই মূল্যবোধকে আবার বহুদিন টিকতে হবে এমন কোনো কালনিরপেক্ষ সংজ্ঞা, রীতি বা নিয়ম নেই। প্রতি মূহূর্তে পাল্টাচ্ছে আমাদের চিন্তাধারা, বোধ বুদ্ধি-অনুভূতি। মূল্যবোধও তাই যাচ্ছে পাল্টিয়ে। অতীতে যা বলতে বা ভাবতে আমাদের দ্বিধার সঞ্চার হতো, আজ তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন নজীর প্রায়ই মেলে। মূল্যবোধ কোনো অচল অনুভূতির নাম নায় বরং সচল প্রগতিবাদই এর ভিত্তি। মূল্যবোধ উৎসাহ দেয় পুরাতন জীর্ণ ঘুণেধরা রীতি-রেওয়াজের পরিবর্তন সাধনে। উৎসাহ দেয় বিপ্লব করতে বিদ্রোহ করতে ঐসব বিবাদ বিসম্বাদের বিরুদ্ধে, যা মানুষের আসল পরিচয় মনুষ্যত্বকে হত্যা করে। বিদ্রোহ বিপ্লব তাই নতুন নতুন মূল্যবোধের জন্ম দেয়। আবার মূল্যবোধও বিপ্লব ও বিদ্রোহের সূচনা করে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- একুশের চেতনা