মব সন্ত্রাসের বিভীষিকা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় ঘটনা ছিল মব সন্ত্রাস। এই সময় বাংলাদেশের জনজীবনে একটি আতঙ্কজনক বাস্তবতা বারবার ফিরে এসেছে—মব সহিংসতা। কোনো ঘটনা ঘটলেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছানোর আগেই উত্তেজিত জনতা বিচারক ও জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে—এমন দৃশ্য বহুবার দেখা গেছে। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং স্থানীয় ক্ষোভ—সব মিলিয়ে এক ধরনের ‘মব কালচার’ সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রথম এবং প্রধান প্রত্যাশাই ছিল, দেশে যেন মব সন্ত্রাসের অবসান হয়। সাধারণ মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন—বাংলাদেশে আর কোনোভাবেই মব সহিংসতা সহ্য করা হবে না।
সচিবালয়ে প্রথম কর্মদিবসে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশে দাবি-দাওয়া থাকবে, প্রতিবাদ হবে, মিছিল-সমাবেশ চলবে—কিন্তু তা হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে। মহাসড়ক অবরোধ, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, সহিংসতা—এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই বক্তব্য কেবল প্রশাসনিক সতর্কতা নয়; এটি আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক প্রকাশ্য অঙ্গীকার। কারণ মব সন্ত্রাস শুধু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার নাম নয়—এটি বিচারব্যবস্থা, সংবিধান ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাই ছিল মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে না পারা। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ মতে, গত দুই বছরে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৮ জন নিহত হন, আর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় কমপক্ষে ১৯৭ জনে। অধিকাংশ ঘটনাই গুজবনির্ভর—বিশেষ করে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ সন্দেহ, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, কিংবা চুরি-ডাকাতির গুজবকে কেন্দ্র করে। পরে অনেক ক্ষেত্রেই প্রমাণ হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ ছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে তার জীবন, পরিবার ও সামাজিক মর্যাদা ধ্বংস হয়ে গেছে।
মব সহিংসতার ধরনও বহুমাত্রিক। কোথাও গুজব ছড়িয়ে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, কোথাও ধর্মীয় উসকানিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ কখনো কখনো সহিংস জনতায় রূপ নিয়েছে। আবার সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, বাউল সম্প্রদায়, ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদেরও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। এসবই প্রমাণ করে—আইনের বাইরে গিয়ে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে।
মব মানসিকতার বিস্তারের পেছনে একটি বড় কারণ হলো আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা। অনেকেই মনে করে, বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগে; তাই তাৎক্ষণিক শাস্তিই ন্যায্য। এই ধারণা অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ জনতার হাতে বিচার মানে প্রমাণ, সাক্ষ্য, যুক্তি—সবকিছুকে উপেক্ষা করা। এতে প্রকৃত অপরাধী অনেক সময় পার পেয়ে যায়, আর নিরপরাধ মানুষ শিকার হয় জনরোষের।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি ইতিবাচক দিক হলো—তিনি গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছেন। প্রতিবাদ নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য। গণতন্ত্র মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; তবে সেই স্বাধীনতা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার লাইসেন্স নয়। অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা, জরুরি সেবা বন্ধ করে দেওয়া, জনসম্পদ ধ্বংস করা—এসব গণতান্ত্রিক চর্চা নয়, বরং নৈরাজ্য।
তবে কেবল ঘোষণা দিয়ে মব কালচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাস্তব সংস্কার জরুরি। আইনের শাসন মানে—আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য আলাদা মানদণ্ড থাকলে মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারায়। বিচার হবে আদালতে, রাস্তায় নয়; গ্রেফতার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, চাপ বা প্রভাবের কারণে নয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মব ভায়োলেন্স