স্টারমার ও ৫০ ব্যবসায়ীর চীন সফরের অর্থনীতি
গত ৫০ বছরের মধ্যে ব্রিটেনের মাত্র তিনজন প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করেছেন। তাঁরা হলেন লৌহমানবী হিসেবে পরিচিত রক্ষণশীল দলের মার্গারেট থ্যাচার (১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে) ও একই দলের থেরেসা মে (২০১৮ সালে) এবং শ্রমিক দলের কিয়ার স্টারমার (২০২৬ সালে)। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে চীনের সঙ্গে ব্রিটেনের শ্রমিক দলেরই তুলনামূলকভাবে অধিক সখ্য থাকার কথা থাকলেও গত অর্ধশতাব্দীর মধ্যকার চীন সফরে রক্ষণশীলেরাই যে এগিয়ে থাকলেন, এর কারণ যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক। এবং সম্প্রতি (২৮-৩১ জানুয়ারি ২০২৬) কিয়ার স্টারমার যে ৫০ জনের বেশি ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নিয়ে চীন সফরে গেলেন, সেটির কারণও মূলত অর্থনৈতিক। আর এমন এক সময় ও পরিস্থিতিতে এ সফর অনুষ্ঠিত হলো, যখন একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও ভূ-অর্থনৈতিক কারণে এ সফরে যাওয়া তাঁর জন্য প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। বিষয়টি খানিকটা খতিয়ে দেখা যাক।
গত ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী ব্রিটেনে বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ১ শতাংশ ও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই উচ্চতর, অর্থাৎ অধিকতর উদ্বেগজনক। অথচ এসব ক্ষেত্রে ইইউ থেকে অধিকতর ভালো থাকার আশা নিয়েই ব্রিটেন গণভোট করে ২০২০ সালে ইইউ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর কাটতে না কাটতেই তারা এখন আবার ইইউতে ফিরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে, যার মূল কারণও অর্থনীতি। এদিকে আগ্রাসী চরিত্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো নিজেদের দীর্ঘকালীন মিত্র ব্রিটেনের সঙ্গেও তাদের শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ইস্যুতে ক্রমাগতভাবে বৈরীপূর্ণ আচরণ অব্যাহত আছে। বিষয়টি ব্রিটেনের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক হতাশা ও বিরক্তিরই কারণ ঘটায়নি, বরং দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের বিবেচনায় তাদের সামনে বড় ধরনের ভয় ও অনিশ্চয়তাও তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের জন্য চীনের মতো বৃহৎ জনসংখ্যা ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির একটি দেশের সঙ্গে নতুন পরিসরে বাণিজ্যিক অংশীদারত্বে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে বৈকি! সে ক্ষেত্রে চীনকে ব্রিটেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করলেও অত্যুক্তি হবে না। এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংও কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে গত ২৯ জানুয়ারি বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনায় তেমনটি ঘটবারই ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ব্রিটেনে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) হারও এখন অনেকটাই নিম্নমুখী, যা ইতিমধ্যে দেশটির কর্মসংস্থান পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। অন্যদিকে চীনই হচ্ছে এই মুহূর্তে পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যার শত শত নয়, হাজার হাজার উদ্যোক্তা উদ্বৃত্ত পুঁজি নিয়ে ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের জন্য সুযোগের অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছেন। এরূপ পরিস্থিতিতে ব্রিটেন যদি চীনা বিনিয়োগকারীদের নিজ দেশে টানতে পারে, তাহলে সেটি উভয় দেশের জন্যই গতানুগতিক মঙ্গলের চেয়েও বড় কোনো উপকার বয়ে আনতে পারবে। এতে করে ব্রিটেনে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে তেমনি তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ব্যাপকভাবে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। তদুপরি ট্রাম্প তথা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক যখন-তখন ‘শাসানোর’ অমর্যাদাকর হম্বিতম্বি থেকেও তারা বহুলাংশে রক্ষা পাবে। অপরদিকে চীনা উদ্যোক্তারা ব্রিটেনের মতো নিরাপদ দেশে বিনিয়োগের সুযোগ পেয়ে শুধু লাভবানই হবেন না, এর মাধ্যমে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তিসহ ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করতে পারার কাজটিও তাঁদের জন্য অনেকখানি সহজ হয়ে আসবে। প্রসঙ্গত, ব্রিটিশদের মতো চীনারাও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়টি ভালোই বোঝেন এবং সে কারণেই ব্রিটিশদের জন্য চীনে প্রবেশকে ভিসামুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশরা ঐতিহাসিক কাল থেকে শিক্ষা ও সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, রাজনীতি ও সমাজ ইত্যাদিতেই শুধু এগিয়ে নেই, এসবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে পেছন থেকে সম্পদ-সমর্থন জোগানোর জন্য দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার কৌশলটিও তারা ভালোই বোঝে। আর তা বোঝে বলেই এখন থেকে সাড়ে ৩০০ বছরের বেশি সময় আগে ১৬৫৮ সালে তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে জেমস হার্টকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে পাঠিয়েছিল, যা পরে ঔপনিবেশিক শাসনে রূপান্তরিত হয়েছিল। সাড়ে ৩০০ বছর পর উদ্দেশ্যের সে ধরন এখন পুরোপুরি পাল্টে গেলেও মুনাফাই যে পুঁজির মূল ধর্ম, সে মূল চরিত্র এখনো একইভাবে অপরিবর্তিত আছে। আর তা আছে বলেই ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ও তাঁদের প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের ধারণায় এটি স্পষ্ট যে ১৪০ কোটি জনসংখ্যা এবং দ্রুত বিকাশমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দেশ চীন অপেক্ষা অধিক মুনাফা ও ব্যবসার সুযোগ এই মুহূর্তে তাঁদের আর কেউ বা কোনো দেশ দিতে পারবে না। আর সে কারণেই স্টারমার তাঁর চার দিনের চীন সফরে সঙ্গী করেছেন ৫০ জনের অধিক ব্যবসায়ীকে, যাঁরা নিজ নিজ ব্যয় নিজেরাই বহন করেছেন। এটি বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের সফর হলে সে ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গী হতেন দৃষ্টিকটু সংখ্যক পছন্দের উজির-আমাত্য ও চাটুকারেরা, আর তাঁদের ব্যয় বহন করতে হতো দেশের সাধারণ জনগণকে।
সে যাই হোক, ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বিরাজমান স্থবিরতা, পুনরায় তাদের ইইউতে ফিরে যাওয়াসংক্রান্ত বিষয়ের অনিষ্পন্নতা, ন্যাটোতে ব্রিটেন ও ইইউভুক্ত দেশসমূহের থাকা না-থাকা ইত্যাদি নানা চলমান জটিলতার পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা হুমকি ও আস্ফালনের প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে ব্রিটেনের নতুন ধারার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এখন শুধু সময়ের দাবিই নয়, তাদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষারও জিয়নকাঠি। তবে সমকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির হিসাবনিকাশ থেকে এটি প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায় যে আপাতত এ যাত্রা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ভিত্তি করে শুরু হলেও অচিরেই তা নতুন আঙ্গিকের বৃহত্তর কৌশলগত বৈশ্বিক সম্পর্কে রূপান্তরিত হলে তাতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আর এই সূত্রে এরূপ বলাটাও বোধকরি প্রাসঙ্গিক হবে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নানা আগ্রাসী ও বিশ্বশান্তির পরিপন্থী আচরণের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকেই বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন যে পুরো ভূরাজনীতিই এখন আমূল পাল্টে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এবং সে ক্ষেত্রে চীন ও ব্রিটেনের মধ্যকার নতুন সম্পর্কই হতে পারে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও সম্পর্কের নতুন সূচনা, যার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘকালীন একচেটিয়া আধিপত্যকে প্রায় পুরোপুরিই হারিয়ে ফেলতে পারে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- চীন সফর
- কিয়ার স্টারমার