দ্বন্দ্ব ছিল, দ্বন্দ্ব থাকবেই
রাষ্ট্রভাষার বিষয়টা তো দ্বন্দ্বেরই ঘটনা একটা। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব। বাংলা ভাষার কপালেই ছিল এটা যে, একেবারে শুরু থেকেই তাকে যুদ্ধ করে এগোতে হবে; যুদ্ধটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই। রাষ্ট্র কখনোই তার পক্ষে ছিল না। এত শত বছর পরে, হাজার বছরের ইতিহাস পার হয়েই আসলে বাংলা ভাষা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে রাষ্ট্রভাষায়, কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের অবসান যে হয়েছে, তা বলা যাবে না। রাষ্ট্র বিদেশমুখো, সমাজের অধিপতি শ্রেণি বাইরে যা-ই বলুক, ভেতরে ইংরেজিই পছন্দ করে, উচ্চশিক্ষার ভাষা এখন অবশ্যই ইংরেজি।
সমস্যাটাই দ্বন্দ্বের ব্যাপার। অবশ্যই। দ্বন্দ্বের শেষ নেই, আসলেই। শেষ হওয়ার উপায়ও নেই। এমনকি মীমাংসা হবে বলে যে মনে করি তা-ও হয় না, একটি বাস্তবতা থেকে আরেকটি বাস্তবতায় উন্নতি ঘটে মাত্র, সেখানেও দ্বন্দ্ব থাকে, নিম্নের স্তরে যেমনটি ছিল। এই সত্যটা না বুঝলে অনেক কিছুই বোঝা যায় না—সমাজের নয়, ব্যক্তিরও নয়।
আমাদের কালেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল। কেন ঘটল বুঝতে হলে খবর নিতে হবে ওই দ্বন্দ্বের। একটি দ্বন্দ্ব ছিল সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের। তার বিষয়ে সোভিয়েত নেতৃত্ব সজাগ ছিল শুরু থেকেই। জানত সাম্রাজ্যবাদ সহ্য করবে না সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে, শেষ করে দেবে সুযোগ পেলেই। সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাই লড়তে হয়েছে যেমন হিটলারের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তেমনি আমেরিকাসহ সমগ্র সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের বিরুদ্ধে। সে যুদ্ধটা চলছিল। কিন্তু ক্রুশ্চেভের ক্ষমতা লাভের পর থেকে যখন ক্রমাগত শক্তিশালী হতে থাকল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি, তখন থেকেই দুর্বল হতে থাকল সে ভেতরে ভেতরে।
কেননা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বলতে বাস্তবে কিছু নেই, থাকা সম্ভব নয়। বাস্তবে আছে জয়, কিংবা পরাজয়। শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের জয় হলো, সমাজতন্ত্র পরাজিত হলো; তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে নয়, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে; তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র আছে এবং থাকবে।
আমাদের নিজেদের ইতিহাসেও বর্তমানে দ্বন্দ্বের কোনো অভাব নেই, ভবিষ্যতেও যে অভাব দেখা দেবে তা নয়।
একটা দ্বন্দ্ব ছিল বিদেশিদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ব্রিটিশ যুগে; সে যুগেই বিশেষভাবে। এই জন্য যে ওই কালের শাসকেরা সাম্রাজ্যকে যত গভীরে প্রবিষ্ট করে দিয়েছিল ততটা আর কেউ করতে পারেনি; এবং এই কারণেও যে ওইকালে সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকার বিষয়ে এ দেশের মানুষ সচেতন ছিল অন্য যেকোনো কালের তুলনায় অধিক পরিমাণে। প্রধান দ্বন্দ্বটা ছিল সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গেই।
সেই দ্বন্দ্বকে প্রধান করতে দিয়ে কখনো কখনো সামন্তবাদের সঙ্গে জনগণের যে দ্বন্দ্ব ছিল, সেটাকে লক্ষই করা হয়নি; বরং সামন্তবাদী মনোভাবকে উৎসাহিত করা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলন। এই আন্দোলনের আন্তরিকতা ও লক্ষ্য উভয় ব্যাপারেই কোনো সংশয় ছিল না। কিন্তু ওই বাঘ ও নেকড়ের ব্যাপারটি ঘটে যাচ্ছিল এ ক্ষেত্রেও; সাম্রাজ্যবাদের বাঘকে রুখতে গিয়ে পথ ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল সামন্তবাদী নেকড়েদের—শক্তিশালী হতে এবং উৎপাত করতে। সামন্তবাদ সেকালের অর্থনীতিতে ছিল, অর্থনীতির প্রধান ক্ষেত্র কৃষি, সেখানে সে-ই ছিল প্রধান সত্য; আর ছিল সংস্কৃতিতে—ভক্তি, আধ্যাত্মবাদ, কুসংস্কার, বহির্জগৎবিমুখতা, অভাব ছিল না এসবের কোনো কিছুরই।
সামন্তবাদও যে সমাজপ্রগতির শত্রুপক্ষ এই সহজ সত্যটিকে অস্বীকার করে শুধু নয়, সামন্তবাদকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুদ্ধে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করে, ধর্মতান্ত্রিকতা ও বহির্জগৎবিমুখিতাকে প্রশ্রয় দিয়ে যে আন্দোলন গড়ে উঠল, তার প্রবলতার ভেতরেই রয়ে গেল মস্ত এক দুর্বলতা। যার নাম সাম্প্রদায়িকতা। সে দুর্বলতা যে কত নিষ্ঠুর ও ক্ষতিকর, তা আমরা সইতে সইতে বুঝেছি এবং এখনো শেষ হয়নি সহ্য করার ও বোঝার। সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বটাই ছিল প্রধান; কিন্তু তাই বলে সামন্তবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বটাও উপেক্ষার বিষয় ছিল না, অবশ্যই বিষয় ছিল না উৎসাহ প্রদানের; কিন্তু উৎসাহই তো দেওয়া হয়েছে। ফলে সাতচল্লিশের স্বাধীনতার লড়াই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতে। এত বড় কলঙ্ক ও ক্ষতি কম দেশকেই বহন করতে হয়েছে, যা আমরা করেছি আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সমস্ত বড়াইকে কাঁধে নিয়ে।
হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বটা অবাস্তবিক ছিল না। বিরোধ অবশ্যই ছিল। কিন্তু সেটা হলো হিন্দু মধ্যবিত্তের সঙ্গে মুসলিম মধ্যবিত্তের, প্রতিষ্ঠিতের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাকামীর, সেটি জনগণের দ্বন্দ্ব ছিল না; খেতে, কারখানায়, হাটে-মাঠে নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র হিন্দু এবং মুসলিম ছিল ভাই ভাই; তারা একসঙ্গে কাজ করেছে, পাশাপাশি বসবাস করেছে, যুগের পর যুগ ধরে; বিরোধ নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু সেটা সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়নি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- দ্বন্দ্ব
- রাষ্ট্র ভাষা