সাগর-রুনির আত্মা আহ্বানই কি শেষ ভরসা?
পেশাগত জীবনের শুরুর দিকে কিছুদিন এটিএন বাংলায় কাজ করেছি। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি যেদিন সাংবাদিক মেহেরুন রুনি ও সাগর সরওয়ার নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তখন আমি ওই চ্যানেলটিতে কর্মরত। কারওয়ান বাজারের ঢাকা ট্রেড সেন্টারের আট তলায় এটিএন বাংলার অফিস থেকে চলে যাওয়ার সময় ১০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকেলে মেহেরুন রুনি বলেছিলেন—‘যাই রে!’ সেটিই ছিল মেহেরুন রুনির সঙ্গে আমার শেষ কথা। আর অফিস থেকে শেষবারের মতো রুনির মেঘের কাছে ফেরা, শেষবারের মতো ঘরে ফেরা। হ্যাঁ, পরদিন বিকেলে মেহেরুন রুনি এটিএন বাংলায় এসেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন কফিনবন্দি, নীরব-নিথর। কী বেদনাদায়ক, বীভৎস সেই দিন!
নিঃসন্দেহে সাংবাদিক দম্পতির এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এরপর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বহু ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রুনির চরিত্রহনন, পরকীয়া প্রেমের কল্পকাহিনি, আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রতিশ্রুতি, বাগাড়ম্বর, রাজনীতি, তদন্ত নিয়ে টালবাহানা—এমন কিছু নেই যা এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ঘটেনি। এই ঘটনা নিয়ে নাটক, সিনেমাও হয়েছে। তবে হ্যাঁ, শুধু একটি কাজই হয়নি—তা হলো মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, যার ওপর ভিত্তি করে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরুর কথা ছিল। একটু জানিয়ে রাখি, নানা ঘাট ঘুরে এই হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্তের ভার এখন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাঁধে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তের দায়িত্ব থেকে র্যাবকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল, যার অধীনে এই মামলার তদন্ত চলছে। মনে করিয়ে দিই, শুরুতে ওই টাস্কফোর্সকে তদন্ত সম্পন্ন করতে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় অনেক আগেই পেরিয়েছে। বুড়িগঙ্গায় গড়িয়েছে আরও অনেক পানি। কয়েকজন উপদেষ্টারও বদল হয়েছে। কিন্তু তদন্ত শেষ হয়নি। সবশেষ তথ্য হলো, তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক এখনও হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। এ নিয়ে প্রতিবেদন জমার তারিখ সব মিলিয়ে পিছিয়েছে ১২৪ দফা।
এটিএন বাংলার সংবাদকর্মী হিসেবে আমি এই ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেছি। হত্যা মামলার তদন্তও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এখানে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করার তাগিদ অনুভব করছি। প্রথমত, আমার মনে হয়েছে এই মামলার তদন্ত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সম্পন্ন করতে পারত। খুব সম্ভবত সিআইডি মামলার রহস্য উন্মোচনের খুব কাছাকাছি ছিল। কিন্তু শুরুর দিকে অদৃশ্য কোনো কারণে মামলার গতিমুখ পরিবর্তন করা হয়, যা পুরো হত্যা মামলাকেই ভিন্ন পথে পরিচালিত করে। সম্ভবত উল্টো গন্তব্যে নিয়ে যায়। এরপর র্যাব দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরু হয় গল্প ফাঁদা। আমার স্পষ্ট মনে আছে, এ ঘটনার তথ্য সংগ্রহে আমি বহুবার র্যাব সদর দপ্তরে গিয়েছি। আমার বারবারই মনে হয়েছে—তারা ভিন্ন পথে আছেন, যে পথের কোনো দিশা নেই। যার অংশ হিসেবে র্যাব এক সময় চেষ্টা করেছিল ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু তারা সফল হয়নি।