ব্যাংকাস্যুরেন্স যেভাবে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে
ব্যাংকাস্যুরেন্স একটি ফরাসি শব্দ। শব্দটি আমাদের অর্থনৈতিক অভিধানে নতুন সংযোজন। তবে কৌতূহল বা জানার আগ্রহ প্রবল। অন্যদিকে এটি নতুন ধারণা বিধায়, বাংলাদেশে বিষয়টি এখনো আশানুরূপ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পেশা এবং বাইরের মানুষের কাছেও ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।
‘কোনো বীমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে ব্যাংক যদি তার গ্রাহকের কাছে ওই বীমা কোম্পানির পণ্য, তথ্যসেবা বিক্রি করে, সেটাই ব্যাংকাস্যুরেন্স।’ ব্যাংকাস্যুরেন্সের ধারণাটির বাস্তব ভিত্তি বাংলাদেশে নতুন হলেও এর সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ব্যাংকাস্যুরেন্সের শুরুটা ১৮৬০ সালে। বেলজিয়ামের সিজিইআর সঞ্চয় ব্যাংক সর্বপ্রথম বন্ধকি-সংযুক্ত বীমা বিক্রি শুরু করে। প্রথম আনুষ্ঠানিক ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবস্থা চালু হয় ফ্রান্সে ১৯৮০ সালে। মূলত তখন থেকেই এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। অতঃপর পশ্চিম ইউরোপের দেশ স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালে ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবস্থা চালু হয় এবং ধীরে ধীরে এর বড় বাজার গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, জার্মানিতেও এ ব্যবস্থার প্রসার ঘটে এবং মজবুত ভিত্তি পায়। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবস্থা চালু হয় ২০০১ সালে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ পাকিস্তানেও ব্যাংকাস্যুরেন্স সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভারতে মোট বীমা পলিসির ২০ শতাংশ ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ইউরোপের দেশ তুরস্কে এ হার ৮০ শতাংশ।
বাংলাদেশে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের ১ মার্চ জাতীয় বীমা দিবসে। এরপর থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির মধ্যে একের পর এক চুক্তি হচ্ছে। এরই মধ্যে আটটি ব্যাংক আলোচিত ইন্স্যুরেন্স সেবা চালু করেছে। মিলছে আশাব্যঞ্জক সাড়া। বিলম্বে হলেও এটি আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসতে পারে, দেশে দেশে বিদ্যমান বীমা কোম্পানিগুলো ইন্স্যুরেন্স পরিষেবা দেয়ার পরও কেন ‘ব্যাংকাস্যুরেন্স’ নামের নতুন ধারণাটির উদ্ভব হলো বা প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল? ব্যাংকাস্যুরেন্স ধারণাটি উদ্ভবের যথেষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। পাশাপাশি এটাও সত্যি যে ‘প্রয়োজনীয়তাই সৃষ্টির জননী’। তাহলে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, সময়ের চাহিদা পূরণে অনিবার্যভাবেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকাস্যুরেন্স নামের ধারণাটি। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু করার গাইডলাইন প্রকাশ করেছে। ‘মূল উদ্দেশ্য, ব্যাংক ও বীমা খাতের সমন্বয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং এ খাতের আস্থাহীনতা দূর করা।’
ব্যাংকাস্যুরেন্স ধারণাটি কোন পদ্ধতিতে কার্যকর হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর অবদান কীভাবে নিশ্চিত হবে, বিষয়টি আলোচনার অপেক্ষা রাখে। সবাই জানি, বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স মূলত এজেন্টভিত্তিক এবং শাখানির্ভর সেবাপণ্যের ব্যবসা। এজেন্টনির্ভর হওয়ার কারণে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে আস্থার সংকট ছিল পীড়াদায়ক। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর নীতি-কাঠামো এবং অযাচিত শর্তের অস্পষ্টতা ছিল লক্ষণীয়। বীমা দাবি পূরণে ছিল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর শৈথিল্যতা। গ্রাহক হয়রানি অভিযোগ ছিল অনেকটাই প্রতিকারহীন। ফলে বীমা কোম্পানিরগুলোর প্রতি গ্রাহকদের কিছুটা আস্থার সংকট দেখা দেয়। এ আস্থা সংকটের বিষয়টি কোম্পানিগুলোর অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
উল্লেখ্য, ব্যাংক মূলত আমানত, ঋণ ও বিনিয়োগ পণ্য বিক্রি করে। ব্যাংকাস্যুরেন্সের আওতায় এখন থেকে ইন্স্যুরেন্স পণ্যটিও বিক্রি করতে পারবে। ‘অর্থাৎ গ্রাহকের যতগুলো আর্থিক সেবা দরকার তার সবগুলোই এখন এক ছাতার নিচে ব্যাংক থেকে নিতে পারবেন।’ ব্যাংকগুলো বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার প্রত্যাশা থেকে এ পরিষেবার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলোতে এ পরিষেবা অনেক আগেই জনপ্রিয়তা এবং মজবুত ভিত্তি লাভ করেছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ব্যাংকের মাধ্যমে বীমার সুবিধা দেয়ার যৌক্তিকতা এবং বাজার চাহিদা রয়েছে। ব্যাংকাসুরেন্স নামের বীমা পণ্য বিক্রির বিপরীতে ব্যাংক নির্ধারিত হারে কমিশন লাভ করবে। সেবাটি তদারকির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যাংকাসুরেন্স নামে আলাদা শাখা রয়েছে। বীমা নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিআরএ বীমা-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ইউনিট চালু করেছে।
আইনগতভাবে ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু করতে আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে পরপর তিন বছর মুনাফা অর্জন করতে হবে। একটি ব্যাংক একই সঙ্গে তিনটি লাইভ ও তিনটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের কম, কেবল তারাই এ কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার আইনগত অধিকার রাখে।