নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ কী
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসংক্রান্ত নিরেট পরিসংখ্যান জানা না থাকলেও প্রায় সবাই একবাক্যে বলছেন-আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ভালো নেই।
একটি দৈনিকের নিজস্ব প্রতিবেদকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে চুরির মামলা বেড়েছে ১২ শতাংশ, ডাকাতির মামলা বেড়েছে ৪৩ শতাংশ, ছিনতাই বা দস্যুতার মামলা ৩৭ শতাংশ এবং অপহরণের মামলা বেড়েছে ৭১ শতাংশ। মামলা বৃদ্ধি মানেই কি অপরাধ বৃদ্ধি? সব সময় তা নাও হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিছক ঝামেলা-ঝক্কি এড়ানোর জন্য মামলার পথ বেছে নেন না। ফলে মামলার চেয়ে অপরাধের সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা। আবার অনেক সময় প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করার জন্য ভুয়া মামলার আশ্রয় নেওয়া হয়। এমন ক্ষেত্রে মামলার চেয়ে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা কম। পরিসংখ্যানের এসব দুর্বলতা সত্ত্বেও আমরা মোটা দাগে বলতে পারি, মামলার সংখ্যা অপরাধের প্রতিফলন ঘটায়। সমাজজীবনে অপরাধ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও চলাচলে বেশি প্রভাব ফেলে এবং নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, দস্যুতা ও অপহরণ। এগুলোর বাইরে আরও অনেক ধরনের অপরাধ রয়েছে। যেমন: খুনখারাবি বা হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক ও অন্য কারণে সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা।
পত্রিকাটি একটি উদাহরণ হিসাবে কাজী মোহাম্মদ আ. হাদিদ নামে এক ব্যক্তির দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। তিনি একজন বেসরকারি চাকুরে। অফিসের কাজ শেষে তিনি প্রায়ই মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহণ, অর্থাৎ রাইড শেয়ার করেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে এখন শতসহস্র কর্মজীবী রয়েছে, যারা তার কর্মক্ষেত্র থেকে পাওয়া বেতন বা মজুরি দিয়ে সংসার চালাতে পারেন না। এজন্য তাদের অতিরিক্ত সময় কাজ করে আয় বাড়াতে হয়। এতে ব্যক্তিবিশেষের শ্রমঘণ্টা বেড়ে যায় এবং তিনি পরিবারকে যথোপযুক্ত সময় দিতে পারেন না। নিজের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্রামও ভোগ করতে পারেন না। বেঁচে থাকার জন্য এই যে চাপ, তা এমন একধরনের মনস্তত্ত্ব তৈরি করে, যা হতাশা উদ্রেককর। যে সমাজে জীবনযাত্রা এরকম, সেই সমাজেও হতাশাজনিত অপরাধ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ব্যক্তিবিশেষের পারিবারিক জীবনে তুমুল অশান্তি আসতে পারে।
আমরা কাজী মোহাম্মদ আ. হাদিদের গল্পটি বলছিলাম। তিনি গত বছরের ২৪ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর বনানীতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। তার মামলার এজাহারে লেখা হয়েছে, যাত্রী নামানোর পর কাজী মোহাম্মদ আ. হাদিদ বনানী মাঠের কাছে মূত্রত্যাগ করতে গেলে চারজন তাকে ছরিকাঘাতের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তাকে মারধর করা হয়। ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার করলে তিনি ও জনতা মিলে দুজনকে ধরে ফেলেন। এ সময় একটি হাতে আঘাত পান তিনি। তার মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায় দুজন।
হাতে আঘাত পাওয়ার কারণে মাসখানেক কাজে যেতে পারেননি উল্লেখ করে আ. হাদিদ বলেন, তার কারণে নির্মাণ প্রকল্প থামিয়ে রাখা যায় না বলে অফিস নতুন লোক নিয়েছে। মোবাইল ফোনটি আদালতে জব্দ ছিল। সেটি ছাড়িয়ে নিতে আইনজীবীর পেছনে সাড়ে ৪ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। মোটরসাইকেলের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স তিনি এখনো তুলতে পারেননি। আঙুলের ছাপ না মেলাসংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছেন।
আ. হাদিদ ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার টাকা হারিয়েছেন, তিনি আহত হয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, মোটরসাইকেলের কাগজপত্র তুলতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, মোবাইল ফোন ফেরত পেতে টাকা খরচ করতে হয়েছে এবং তিনি এখনো কর্মহীন। আ. হাদিদের কাহিনি থেকে বোঝা যায়, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া কত ব্যয়বহ। এসব কারণে অপরাধকবলিত হওয়া সত্ত্বেও দেশের বেশির ভাগ মানুষ থানা-পুলিশ ও আইন-আদালতের আশ্রয় নিতে চায় না। কারণ, সেই পথে গেলে ক্ষতির অঙ্ক ১০ গুণ কিংবা শতগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন অগণিত ছিনতাই হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী কোনো আইনি প্রতিবিধানের আশ্রয় নেন না। কারণ শুধু একটাই, আর তা হলো ছিনতাইয়ে যে ক্ষতি হয়, এর চেয়ে অনেক ক্ষতি হয় পুলিশ ও আইনি সহায়তা নিতে গেলে।
ছিনতাই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের একটি গল্প আছে। নিউইয়র্ক শহরের বেশকিছু অ্যাভিনিউ ছিনতাইয়ের জন্য বহুল আলোচিত। এ শহরে রাস্তায় বের হতে হলে পথচারীর শুভানুধ্যায়ীরা পরামর্শ দেন অন্তত ৩০ ডলার সঙ্গে রাখতে। কারণ, ছিনতাইকারীর হামলার মুখোমুখি হলে অন্তত সুবোধ বালকের মতো ৩০ ডলার দিয়ে দিতে হয়। অন্যথায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারানোর শঙ্কাও থাকে। একবার নিউইয়র্ক শহরে ছিনতাই বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ অবস্থায় সাধারণ লোকজন রাস্তায় না বেরিয়ে বাড়িতে থাকাই শ্রেয়বোধ করল। ছিনতাইকারীরা দেখল তাদের জন্য কোনো শিকার নেই। এ অবস্থায় ছিনতাইকারীদের আয় শূন্যের কোঠায় নেমে গেল। এ পরিস্থিতি দেখে ছিনতাইকারীরা সিদ্ধান্ত নিল তারা ছিনতাইয়ের মাত্রা এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনবে, যাতে মানুষজন রাস্তায় বেরোতে সাহসী হয়, তাদের কাছ থেকে ছিনতাইও করা যায় এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়ার হারও কমে যায়। এভাবে পথচারী, ছিনতাইয়ের ঘটনা এবং পুলিশ কর্তৃক অপরাধী আটকের ঘটনার মধ্যে একটি ভারসাম্য বা Equilibrium তৈরি হয়। অর্থাৎ অপরাধ ঘটবে কি না, তার মাত্রা সহনীয় থাকবে এবং পুলিশও কিছু কর্মদক্ষতা দেখাতে পারবে। রাজধানী ঢাকায় যে ছিনতাই হয়, তা নিয়ে এ ধরনের কোনো মডেলের কথা কি আমরা ভাবতে পারি?