কৃষি খাতের সংস্কারও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাত অন্যতম প্রধান ভিত্তি, জিডিপিতে যার অবদান প্রায় ১১-১৩ শতাংশ। প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এ খাত, একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করে। শিল্প ও সেবা খাতের প্রসারের কারণে জিডিপিতে এর অবদান ক্রমেই কমলেও গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং প্রধান শস্যগুলো (ধান, পাট, মৎস্য) উৎপাদন করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি আয় বাড়াতেও সাহায্য করে।
দেশে কৃষিজমির পরিমাণ প্রতিদিনই কমছে। প্রায় ৫৬ শতাংশ কৃষিজমি উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। ৪০ শতাংশ কৃষক পরিবার ভূমিহীন বর্গাচাষি। দেশের অর্ধেক কৃষক যথাযথ মজুরি পায় না। একদিকে বাড়ছে কৃষি উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে ফসলের উপযুক্ত দাম পাচ্ছে না কৃষক। বহুজাতিক কোম্পানির ওপর কৃষি অনেকাংশে নির্ভরশীল। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যান্ত্রিকীকরণে কৃষি খাত এখনো অনেক পিছিয়ে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) তথ্যানুযায়ী, ৫৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো জমি নেই। ০.৫ একরেরও কম জমি আছে এমন প্রান্তিক চাষির হার ৪১ শতাংশ। দেশে প্রতিবছর ০.২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। একদিকে জমি কমছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে উৎপাদন কমছে, ফলে প্রবৃদ্ধিও কমছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো প্রথাগত কৃষিকে পেছনে ফেলে প্রযুক্তি ও উন্নত অবকাঠামোনির্ভর চাষাবাদ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সরঞ্জামের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করছে। কৃষি খাতে সময়ানুগ নীতি সংস্কার ও সরকারি সহায়তার কারণেই তারা এগুলো করতে পেরেছে।
অথচ গত ৩৫ বছর ধরে দেশে কৃষি খাতে কোনো সংস্কার নেই। কৃষি খাতের উন্নয়নে ১৯৮৮ সালে ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে এ খাতের পর্যালোচনা (রিভিউ) করা হয়। ১৯৯০ সালেও একটি অর্থনীতি রিভিউ করা হয়। এ দুটি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ফসল বৈচিত্র্যকরণের সুপারিশ করা হয়। ১৯৯০-এর রিভিউর পর ৩৫ বছর কেটে গেলেও কৃষি খাত সংস্কারে দেশে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কৃষিনির্ভর দেশগুলো এখন ড্রোন ও স্মার্ট প্রযুক্তির দিকে আগালেও আমাদের কৃষি ভুগছে পুরোনো সমস্যায়। কৃষির অন্যতম প্রধান উপাদান বীজ। এ বীজের বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। কৃষিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। গত পাঁচ দশকে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ থাকলেও গত অর্থবছরে এটি ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। নীতি সহায়তার অভাবে কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশে বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ২ শতাংশ কৃষি খাতে যায়। আবার এ খাতে বিতরণকৃত ঋণের ৭৫ শতাংশই যায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) মাধ্যমে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরির (এমআরএর) তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালে তাদের ৩ কোটি ২১ লাখ ঋণগ্রহীতার মাঝে ২ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। সহজ ভাষায় বললে, গ্রামীণ ও কৃষি অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরাট ভূমিকা রয়েছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, এমএফআইগুলোর বিতরণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি ঋণও বাড়ছে। ২০২৪ সালে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর এনপিএল ছিল ৮ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৫ শতাংশ। এক বছরে এনপিএলের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫৭ শতাংশ। এমএফআইগুলোর জন্য এটি একটি অশনিসংকেত। এনপিএল বৃদ্ধির নানা কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, দেশের কৃষি খাতের ক্ষয়িষ্ণুতা। কৃষি খাতের সংস্কার বা আধুনিকায়ন না করলে এ খাতের বিপর্যয়ের সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোরও বিপর্যয় হবে, এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদন ব্যয় না উঠলে ক্ষুদ্রঋণ কর্মী যতই চাপাচাপি করুক গ্রহীতার ঋণ খেলাপি হবেই। দারিদ্র্যবিমোচন ও নানাবিধ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গত সাড়ে চার দশকে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো যে অবদান রেখেছে, তা অচিরেই হুমকির মুখে পড়বে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রান্তিক চাষিকে শুধু আর্থিক সহায়তাই দিতে পারবে। কিন্ত নীতি সহায়তা দিতে হলে সরকারকেই যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- কৃষি খাত
- জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি