নতুন প্ল্যাটফর্ম, পুরোনো স্মৃতি: এনপিএ কীভাবে এগোবে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন এক ধরনের দ্বন্দ্বময় মুহূর্তে আটকে আছে। একদিকে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনে সমাজে প্রত্যাশার ঢেউ উঠেছে, অন্যদিকে সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতিদানকারী রাজনৈতিক পরিসর প্রতিনিয়ত ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। মানে, এখানে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তার এ লক্ষ্যে দরকারি দিকনির্দেশনা নেই। পরিবর্তনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা থাকলেও সেই পরিবর্তন বহন করার মতো কাঠামো নেই। এ সত্ত্বেও এই শূন্যতার মধ্যে একের পর এক নতুন প্ল্যাটফর্ম, জোট ও নাগরিক উদ্যোগের আবির্ভাব ঘটছে। ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ বা এনপিএ এর সাম্প্রতিক উদাহরণ।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, এনপিএ নিজেকে বাম, মধ্যপন্থী বা ডানপন্থী কোনো পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করতে চায়নি। তারা দলও নয়, আবার কেবল আন্দোলন বা এনজিও-ধাঁচের নাগরিক ফোরামও নয়। তাদের দাবি মতে, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, ক্ষমতা ও জবাবদিহির কাঠামো এবং রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি নতুন করে ভাবনাচিন্তার দাবি নিয়েই তারা সামনে এসেছে। এবং নতুন এই রাজনৈতিক অনুসন্ধানকে বুঝতে গেলে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা ও স্মৃতির ভারও আমাদের আমলে নিতে হবে।
এই ভারের বড় অংশই তৈরি হয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক ধারাগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতা থেকে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে নৈতিক প্রশ্ন তোলার দায়িত্ব যাদের ওপর ছিল, তারাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। জনগণের জীবনের সঙ্গে সংযোগ না রেখে কেবল তাত্ত্বিক ভাষায় কথা বলা, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার লোভ সামলাতে না পারা এবং বাস্তব সংকটে স্পষ্ট অবস্থান নিতে ব্যর্থ হওয়া এইসব ধারাকে ধীরে ধীরে প্রান্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। ফলে রাজনীতি মানুষের কাছে মুক্তির ভাষার পরিবর্তে সন্দেহের বিষয়ে উপনীত হয়েছে। এই হতাশাই নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
কারণ, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ধারাগুলোর সংকটকে নগ্নভাবে উন্মোচন করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ও প্রথাগত নেতৃত্বের প্রভাব বা প্রয়াস ছাড়াই সাধারণ মানুষ তাদের অধিকারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে; রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানে একত্র হয়েছে এবং ভয়কে জয় করে রাজপথ দখল করেছে। আবার, এই ঘটনায় একই সঙ্গে আরেকটি গভীর সত্যও উন্মোচিত হয়েছে। আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের মুহূর্তে যে বিপুল শক্তি জন্ম নেয়, তা নিজে নিজে রাজনৈতিক পরিসরে রূপ নেয় না। সেই শক্তিকে ধারণ করার মতো বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি কল্পনা ও সংগঠিত দায়িত্ববোধ না থাকলে সম্মিলিত সেই শক্তি ইতিহাসের পাতায় স্মৃতি হয়ে থাকে শুধু, রাজনীতির ভাষায় ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাই একদিকে যেমন সংগঠিত জনতার সম্ভাবনার প্রমাণ, অন্যদিকে তাদের সীমাবদ্ধতারও স্বীকারোক্তি। এই দ্বন্দ্ব থেকেই নতুন নাগরিক উদ্যোগগুলোর উত্থান ঘটেছে। তারা জুলাইকে সমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে না নিয়ে রাষ্ট্র, নাগরিক ও ক্ষমতার সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক অসমাপ্ত রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখতে চেষ্টা করছে।
নতুন এই প্ল্যাটফর্মগুলো তাই নিজেদের পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্নে সচেতনভাবে সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। কারণ তারা ভালো করেই জানে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক লেবেল এখন আর বিতর্কের বাইরে নয়; প্রতিটি পরিচয়ের সঙ্গেই দীর্ঘ ইতিহাস, আস্থাহীন ব্যর্থতার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এনপিএ নেতৃবৃন্দ তাই নামের রাজনীতিতে না গিয়ে পদ্ধতির রাজনীতির কথা বলছে; আদর্শের ঘোষণার বদলে রাজনৈতিক আচরণ ও প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছে। আর এ জন্যই গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার কিংবা পরিবেশ সুরক্ষার মতো ধারণাগুলোকে নিছক দলীয় স্লোগান হিসেবে না রেখে এগুলোকে এমন এক ন্যূনতম রাজনৈতিক নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে–যেন এখানে ভিন্ন মত ও ভিন্ন পটভূমির মানুষ অন্তত কিছু মৌলিক প্রশ্নে একমত হতে পারে।
অবশ্য এই প্রচেষ্টার ভেতরেও পুরোনো অভিজ্ঞতার ছায়া অস্বীকার করা যায় না। যারা এই নতুন রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণে যুক্ত, তাদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন বিভিন্ন আন্দোলন, সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রশ্নে তীক্ষ্ণভাবে সংবেদনশীল করে তোলার পাশাপাশি ক্ষমতার সঙ্গে অতিরিক্ত নৈকট্য কত দ্রুত রাজনীতিকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে ফেলে–এই অভিজ্ঞতাও তাই তাদের আছে। তারা নিজেদের কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক পরিচয়ে আটকে রাখতে না চাইলেও ন্যায়, সাম্য ও শোষণবিরোধী চিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্য তাদের রাজনৈতিক বোধের পরিচায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখবে আশা করা যাচ্ছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশের রাজনীতি
- প্ল্যাটফর্ম