উন্নত রাষ্ট্র থেকে আমরা কতদূর?
সেই রাষ্ট্রই উন্নত যা একটি পরিবারের মতো। আধুনিকপূর্ব অনেক সমাজে রাষ্ট্রপ্রধান জনকল্যাণমুখী হলে তাকে পিতৃতুল্য বা মাতৃতুল্য কল্পনা করা হতো। কিন্তু এমন পূর্ণাঙ্গ পরিবারতুল্য রাষ্ট্র সম্ভব কেবল সাম্যবাদে। এমন রাষ্ট্র এখনও কল্পনার বিষয় হলেও পরিবারে এর একটি প্রতিফলন আছে। পরিবার মানুষের একটি শক্তিশালী সাম্যবাদী সংঘ। কিন্তু রাষ্ট্রকে পরিবারের মতো একটি দরদী সংঘে পরিণত করতে বহু লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়। আমরা যেসব রাষ্ট্র আজকের পৃথিবীতে দেখি তার মধ্যে কিছু কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বাদ দিলে আর কোনোটিই ওই আদর্শিক পারিবারিক রূপের ধারেকাছে নেই। এগুলো বেশিরভাগই শোষণমূলক, নির্যাতনমূলক, ভীতিসঞ্চারকারী, ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক, লুণ্ঠনবৃত্তিমূলক ও মুনাফাবৃত্তিক।
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা আছে যা অভিজ্ঞতাজাত ও সত্য। মানুষের আচরণ দেখে ও তার কথা শুনে আমরা বলি তার পরিবার কেমন বোঝা যায়। আবার পরিবার দেখেও অনেকখানি বোঝা যায় তার সদস্য কেমন হতে পারে। কথাটা রাষ্ট্রের বেলায়ও সত্য না হবার কারণ নেই। নাগরিকদের আচার-আচরণ, কথা, সংস্কৃতি, বক্তৃতা-বিৃবতি ইত্যাদি দেখে বোঝা যায় তাদের রাষ্ট্র কেমন। আবার রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি দেখে বোঝা যায় নাগরিকরা কেমন। এরই প্রতিফলন দেখা যায় অন্যান্য দেশের মানুষ ও সংস্থাসমূহ আমাদের নাগরিকদের ও রাষ্ট্রকে কোন চোখে দেখে তার মধ্যে।
বিদেশের বিমানবন্দরে ও আবাসিক হোটেলগুলোতে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি অবিশ্বাস ও তা থেকে নানারকম দৃশ্যমান ও অদৃশ্য হেনস্থার কথা প্রায়ই শোনা যায়। তবে যারা নিজ দেশেই প্রতিদিন হেনস্থার শিকার তারা বিদেশে আর ভালো কী আশা করতে পারেন? এসব দৃষ্টিভঙ্গি ফেলনা নয়। কারণ এর মধ্যে আছে দেশের পণ্য রপ্তানি, দেশের মাটিতে বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাফল্য-ব্যর্থতার রহস্য। নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি যে মন্তব্য করেছিলেন—নেপালকে বাংলাদেশ হতে দেওয়া হবে না—তার উৎসও এই। আবার এ কারণে আমাদের অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, বাংলাদেশ যেন আফগানিস্তান বা অনুরূপ কোনো দেশ হয়ে না যায়!
রাষ্ট্র গড়ে তোলার কাজটা পরিবারের মতো সহজ নয়। আবার রাষ্ট্রপিতা বা রাষ্ট্রমাতা হওয়ার কাজটা আরও দুরূহ। ক্ষমতায় আরোহণ করে কেউ নিজেকে বা নিজের পিতামাতাকে রাষ্ট্রপিতা বা অনুরূপ উপাধিতে ভূষিত করলেই তা হয়ে যায় না। কাগজের পাতায় বা দেয়ালের গায়ে লিখে রাখলেও তা হয় না। সত্য হলে জনগণের মনের মধ্যে তা আপনি গড়ে ওঠে। মনের মধ্যে থাকার সুবিধা সীমাহীন, সেটি আর কেউ ভেঙে ফেলার কিংবা মুছে দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। ফলে সেটাই প্রকৃত। তবে রাষ্ট্র পরিবারতুল্য হলেই যে তা খুব শক্তিশালী হবে তেমন নয়, বরং একসময় তা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কেননা ওইসব রাষ্ট্রেও শোষকচরিত্রের সুবিধাবাদী লোক থাকে এবং তারা গণতন্ত্রের বরাতে অন্য রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। এজন্য রাষ্ট্র কোনো স্থির ব্যবস্থা নয়, গতিশীল। একসময়কার কিছু কল্যাণমূলক রাষ্ট্রেও আজকাল তাই অপশক্তির উত্থান দেখা যাচ্ছে।
এসব কথা বলবার কারণ আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কেমন তা বোঝা। আমার দেশ ও মাতৃভূমি আমার প্রাণপ্রিয় ও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ, এ সত্য দ্বিধাহীন। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দূরে থাক, একটি কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্ররূপ থেকেও বহুদূরে। এর প্রতিফলন আমাদের নাগরিকদের ওপরে পড়ে, আবার তা রাষ্ট্রে প্রতিফলিত হয়। সহজ কথায়, রাষ্ট্রচরিত্র নাগরিক জীবনে প্রতিফলিত হয় এবং ওই প্রতিফলন আবার রাষ্ট্রে দেখা যায়—যেমন সামনে-পিছনে আয়না রেখে মাঝখানে দাঁড়ালে অসংখ্য প্রতিবিম্ব দেখা যায়। নাগরিকের আয়নায় রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের আয়নায় নাগরিক, এভাবে প্রতিফলন চলতেই থাকে।
এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের দায় থাকলেও রাষ্ট্রের দায়ই প্রধান। কারণ ব্যক্তির পূর্ণতার জন্যই রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়, রাষ্ট্রের পূর্ণতার জন্য ব্যক্তি সৃষ্টি হয় না। তাছাড়া রাষ্ট্র একটি যন্ত্র—যাকে ভাঙাগড়া, ঘষামাজা, মেরামত বা প্রয়োজনে নতুন করে তৈরি করা যায়। ফলে যারা এই যন্ত্র পরিচালনা করেন তাদের দায়দায়িত্ব সর্বাধিক। রাষ্ট্রের সাফল্য-ব্যর্থতা সবই তাদের ঘাড়ে বর্তায়। যাদের ব্যর্থতা বহন করার সততা, সাহস, ত্যাগ ও সাধনা নেই, তাদের পিতৃতুল্য বা মাতৃতুল্য হওয়ার লালসা ঘৃণ্য অপরাধ। যাদের এ মহৎ গুণাবলী আছে, এমন নেতা-নেত্রীদের ঘিরেই কেবল জনগণ রাষ্ট্র নামক পরিবারে সার্থকভাবে সংগঠিত হতে পারে। এমন পরিবারে সন্তানের গায়ের রঙ, লিঙ্গ পরিচয়, ভাষা, জাতিত্ব, ধর্ম, বিশ্বাস বা অবিশ্বাস, সম্পদের মালিকানা—সবকিছু লীন হয়ে যায় পারিবারিক সংঘবদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্বের অধিকারে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য পারমাণবিক অস্ত্রে নয়, এই পরিবারতুল্য সাম্যবাদী সংঘবদ্ধতায়। আমরা কি এমন রাষ্ট্র হতে পেরেছি বা হওয়ার চেষ্টা করছি? এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এর একটা উত্তর পাওয়া যাবে সাংবাদিক ও গবেষক আমীন আল রশীদের লেখা ‘বাংলাদেশের সংসদীয় বিতর্ক: জাতীয়তাবাদ, বাকশাল, রাষ্ট্রধর্ম ও অন্যান্য’ গ্রন্থটিতে (মাতৃভাষা প্রকাশ, ২০২৫)। বইটি সরাসরি এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে লেখা না হলেও, অনেক উত্তর পাওয়া যায়। বইটির শুরু এভাবে, “রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশ্বজুড়ে যত মত আছে, নানা সীমাবদ্ধতার পরেও এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রই তুলনামূলকভাবে উত্তম— এ বিষয়ে আপনি হয়তো দ্বিমত করবেন না। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংসদ (এককক্ষ বা দ্বিকক্ষ) কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম— যা সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারে। সরকারের অপরাপর অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে, সেরকম আইনি কাঠামো গড়ে তোলার জন্যও সংসদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।”
কিন্তু তারপর? “স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের হাত ধরেই। যদিও বছর কয়েকের মধ্যে সেখানে ছন্দপতন ঘটে। আসে একদলীয় শাসনব্যবস্থা। গুরুত্বহীন হয়ে যায় জাতীয় সংসদ। এরপর একাধিকবার ‘বন্দুকের শাসন’।” লেখক আরও বলেছেন, “বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের বয়স ৫০ বছরের বেশি হলেও এখানে কোনো ধারাবাহিকতা ছিলো না। দীর্ঘ সময় সংসদ থাকলেও সেখানে সংসদীয় গণতন্ত্রের কোনো চর্চা ছিলো না। ... ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সময়কালেই বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের মোটামুটি চর্চা হয়েছে বলা ধরা হয়। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সময়কালে সংসদে বিএনপি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে থাকলেও সংখ্যায় তারা ছিলো নগণ্য। ... বিশেষ করে দশম সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি যে ধরনের ভূমিকা পালন করেছে, তাতে তাদেরকে ‘সরকারি বিরোধী দল’ বললেও অত্যুক্তি হয় না।”
যে দেশ চুয়ান্ন বছরের যাত্রায় মাত্র পনেরো বছর প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের দেখা পেয়েছে, তার প্রধান রাজনৈতিক চর্চা অসংসদীয় ও অগণতান্ত্রিক হয়েছে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাধীনতার পরপরই সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকে জাতীয়তাবাদ, সংসদ সদস্যদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে তীব্র বিতর্ক উঠেছে যা এখনো চলমান। এসব সিদ্ধান্তে সকলের সমঅধিকারের বদলে সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যই প্রকাশ পেয়েছে। অথচ পরিবারের মানবিকতা হলো দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া সদস্যদের স্বার্থ সর্বাগ্রে রক্ষা করা। রাষ্ট্র যদি ধর্ম, ভাষা, জাতি, সম্পদ বা অন্য কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে চলে, তবে তা পরিবার হতে ব্যর্থ হয় এবং জঙ্গলের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। উল্লিখিত বইয়ে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনের পর থেকে ২০২৪ সালের সর্বশেষ নির্বাচন পর্যন্ত পঞ্চাশ বছরে সংসদে বিরোধী দলের আসন বেড়েছে মাত্র ৯ থেকে ১১-এ। অন্য মত, অন্য দল, অন্য ধর্ম, অন্য ভাষা, অন্য সংস্কৃতিকে বিরোধী মনে করে নিশ্চিহ্ন করার সংস্কৃতি যদি রাষ্ট্রীয় হয়, তবে তা রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাষ্ট্রপ্রধান
- রাষ্ট্র পরিচালনা