১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামো মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও কেন্দ্রের শাসনব্যবস্থার বিপরীতে আওয়ামী লীগের ছয় দফা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা।
এই রাজনৈতিক উত্তাপের মুখে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং কৌশলের অংশ হিসেবে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের ‘এক ইউনিট’ ব্যবস্থা ভেঙে দেন। এর আসল লক্ষ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনর্বিন্যাস করা এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রতিনিধিদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য খর্ব করা। একই সঙ্গে ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’ বা এলএফওতে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে নির্বাচিত গণপরিষদকে ১২০ দিনের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে, অন্যথায় পরিষদ বাতিল হয়ে যাবে।
সামরিক ক্ষমতাকাঠামোর ধারণা ছিল, নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, যা তাদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ অটুট রাখবে। কিন্তু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যা সামরিক জান্তার সমস্ত রাজনৈতিক সমীকরণকে অকার্যকর করে দেয়।
ইয়াহিয়ার আকস্মিক ঘোষণা
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখে পড়ে। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক নেতৃত্ব পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ক্ষমতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে ১৩ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন যে ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে। ১ মার্চ দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি দৃশ্যত স্বাভাবিক ছিল এবং শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ চলছিল। ড. কামাল হোসেন তাঁর মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল বইয়ে লিখেছেন:
‘আওয়ামী লীগের খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটি দিনরাত কাজ করে যাচ্ছিল এবং ১ মার্চের আগেই শাসনতন্ত্র বিল তৈরির কাজ চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। ইয়াহিয়া ১ মার্চ ঢাকা পৌঁছবেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল এবং শেখ মুজিব আমাদের বলে দিয়েছিলেন যে খসড়া শাসনতন্ত্রের একটি আগাম অনুলিপি ইয়াহিয়াকে দিতে হবে।’ (পৃ: ৫৩)
কিন্তু সেদিন বেলা ১টা ৫ মিনিটে রেডিওতে ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। গণতান্ত্রিক রায়ের এই সরাসরি অবমূল্যায়ন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। জগন্নাথ কলেজ ও কায়েদে আজম কলেজের শিক্ষার্থী, আদমজী পাটকলের শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করে রাজপথে নেমে আসেন এবং তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমান চলাচলও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
হোটেল পূর্বাণীতে সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে ২ ও ৩ মার্চ সর্বাত্মক হরতাল এবং ৭ মার্চ জনসভার ডাক দেন। ২ মার্চ ঢাকা কার্যত একটি অচল নগরীতে পরিণত হয়। প্রশাসন, ব্যবসাকেন্দ্র ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এদিন ছাত্রসমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। এই হরতালের ব্যাপ্তি সম্পর্কে জাহানারা ইমাম তাঁর একাত্তরের দিনগুলি বইয়ে লিখেছেন:
‘সকালে নাশতা খাওয়ার পর সবাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলিফ্যান্ট রোডের মাঝখান দিয়ে খানিকক্ষণ হেঁটে বেড়ালাম। একটাও গাড়ি, রিকশা, স্কুটার এমনকি সাইকেলও নেই আজ রাস্তায়।… কী আশ্চর্য! আজকের কাঁচাবাজারও বসেনি। …শেখ মুজিবসহ সবগুলো ছাত্র, শ্রমিক ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে যে সর্বত্র যানবাহন, হাটবাজার, অফিস-আদালত ও কল-কারখানায় পূর্ণ হরতাল পালনের ডাক দেওয়া হয়েছে, সবাই সেটা মনেপ্রাণে মেনে নিয়েই আজ হরতাল করেছে।’ (পৃ:১৩)
২ মার্চ রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ কারফিউ জারি করলে বিক্ষুব্ধ জনতা তা ভঙ্গ করে এবং সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণে শতাধিক মানুষ হতাহত হন। এর প্রতিক্রিয়ায় ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু কর-খাজনা প্রদান বন্ধের নির্দেশ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশব্যাপী সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন। এদিনই প্রথম ঢাকার কোনো সমাবেশে নারীদের লাঠি হাতে অংশ নিতে দেখা যায় এবং স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়।