রাজনৈতিক কালচার পরিবর্তনে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণ জরুরি
জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক সমাজ যেমন গণতন্ত্রে উত্তরণের নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করে, তেমনি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত না হলে জ্ঞানভিত্তিক মানবিক সমাজ বিনির্মাণ প্রায় অসম্ভব। আর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলেই সে সরকার মানবিক ও গণতান্ত্রিক চরিত্রের অধিকারী হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও এখন উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা ঢুকে পড়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার কীভাবে স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করতে পারে, বিগত ১৬ বছর আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের এ অঞ্চলের রাজনীতিতে আগের সেই সহনশীলতা ও উদারতা এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেও এ অঞ্চলের রাজনীতিবিদদের মধ্যে উদার মনস্কতার পরিচয় পাওয়া যেত। উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতা ছাড়া রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের চর্চা ব্যর্থ হতে বাধ্য। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের রাজনীতিতে এটাই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কাজেই বিদ্যমান রাজনৈতিক কালচার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন উদার ও মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের, যিনি সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের মঙ্গলের জন্য আত্মোৎসর্গ করবেন।
দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তার এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নানা কারণেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তাকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তখন থেকে তিনি লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছিলেন। নির্বাসিত থাকা অবস্থাতেই তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং দল পরিচালনা করতে থাকেন। বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার নানাভাবে তারেক রহমানকে হয়রানি করে তার দেশে আসার পথ রুদ্ধ করে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রায় ১ বছর ৪ মাস পর তারেক রহমান দেশে ফিরে আসেন।
দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত থাকার সময়ে তারেক রহমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিপক্বতা লাভ করেছেন। তার কথাবার্তা এবং আচার-আচরণে চমৎকার পরিশীলিত ভাব প্রত্যক্ষ করা যায়। বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তারেক রহমান প্রায় ২০ মিনিট বক্তব্য প্রদান করেন। তার এ বক্তব্যের প্রতিটি বাক্যই ছিল পরিশীলিত এবং মার্জিত রুচির পরিচয়বাহী। তিনি বলেছেন, ‘I have a plan’. তার এ বক্তব্যের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিংয়ের বক্তব্যের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন, ‘I have a dream’. মার্টিন লুথার কিং যেমন তার দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, তারেক রহমানও তেমনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেছেন, আগামীতে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে জাতি-ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিক তাদের ন্যায়সংগত অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারবে। ধর্ম বা গোত্র বিবেচনায় কোনো বিভেদ সৃষ্টি করা হবে না। এমন একটি দেশ আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারবে। ভিন্ন মত পোষণের কারণে কোনো নাগরিককে প্রশাসনযন্ত্রের হয়রানির শিকার হতে হবে না। আগামীতে নির্বাচন নিয়ে যাতে কেউ কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র করতে না পারে বা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তারেক রহমান তার দীর্ঘ বক্তৃতায় একবারের জন্যও তার ওপর নির্যাতনকারী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি। তার এ পরিশীলিত বক্তব্য সর্বমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়েছে।
তারেক রহমানের এ বক্তব্যকে যদি আমরা প্রতীকী অর্থে বিবেচনা করি, তাহলে এটি মানতেই হবে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক-গুণগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আগামীতে যারাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করবেন, তাদের পক্ষে জনমতকে উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না। তারেক রহমান তার পরিকল্পনায় যে বাংলাদেশের চিত্র অঙ্কন করেছেন, বাংলাদেশের মানুষ তেমন একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবেই বাংলাদেশকে দেখতে চায়। তার এ বক্তব্যের মধ্যে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রচিত জুলাই সনদের মূল চিত্র ফুটে উঠেছে। তারেক রহমান যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, তা যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই তার কাঙ্ক্ষিত উদার এবং কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে।
১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজিত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান দুটি উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য ছিল-সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ। বাংলাদেশের মানুষ আন্তরিকভাবেই এ দুটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য সচেষ্ট ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করতে গিয়ে গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতি চরম অবহেলা করে। দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। গবেষকরা প্রমাণ করেছেন, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয় এবং লাখ লাখ মানুষ মারা যায়, তার জন্য খাদ্য সংকট যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী ছিল সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সীমাহীন লুটপাট। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা আগে কখনোই এতটা দুর্নীতিগ্রস্ত ও কলুষিত ছিল না। স্বাধীনতার পর দুটি ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। এর একটি হচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধের মারাত্মক অবক্ষয় এবং দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় অধঃপতন তখন থেকেই শুরু হয়। মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রতকরণ এবং নৈতিক অবক্ষয় রোধ করার জন্য জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের কোনো বিকল্প নেই। আর জ্ঞানভিত্তিক আধুনিক ও নৈতিক সমাজ গঠনের জন্য সবার আগে প্রয়োজন জাতির জন্য উপযোগী ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কোনো সমাজ যদি আদর্শভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠতে না পারে, তাহলে সেই সমাজে বসবাসকারীদের কাছে মানবিক আচরণ প্রত্যাশা করা যায় না।
স্বাধীনতার আগে আমাদের এ অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার সুনাম ছিল। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার মান ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। কিন্তু স্বাধীনতার পর শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক দুর্নীতি ও নকলের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে। প্রশাসনিক পর্যায় থেকে পরোক্ষভাবে নকল প্রবণতাকে উৎসাহিত করা হয়। গুণগত শিক্ষা বিস্তারের পরিবর্তে পাশের হার বাড়ানোর জন্য চেষ্টা চালানো হয়। অনেকের নিশ্চয়ই মনে থাকার কথা-চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার কম হওয়ার কারণে একজন কর্মকর্তাকে বিদ্রুপ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, কমসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাশ করানোর মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ ধরনের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ন্যায় ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা ভেস্তে যায়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন ঘটলে দেশে আবারও নৈতিক বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণ এবং আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যহীনতার কারণে সেই সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে (২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত) বাংলাদেশ ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি পদদলিত করা হয়। উপযুক্ত মানসম্পন্ন ও নৈতিক মূল্যবোধসংবলিত শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে কোনোভাবেই একটি জাতি উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পারে না। বিগত সরকারের আমলে সর্বস্তরে শিক্ষার মানে ব্যাপক অধঃপতন ঘটে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার চেয়ে পাশের হার বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপন করে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তাদের অধিকাংশের জ্ঞানের পরিধি খুবই সীমিত। তারা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। যারা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা অর্জন করছে, তাদের অধিকাংশই উন্মুক্ত বিশ্বের প্রতিযোগিতায় সক্ষম নয়। যেহেতু এরা উপযুক্ত মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না, তাই তারা পরবর্তী জীবনে জাতি গঠনে কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারছে না। যারা এখন শিক্ষা লাভ করছে, তারাই পরবর্তীকালে রাষ্ট্র গঠনে অবদান রাখবে। কিন্তু তাদের অধীত শিক্ষা উপযুক্ত মান এবং নৈতিক গুণাবলীসম্পন্ন না হওয়ার কারণে তারা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে তেমন কোনো অবদান রাখতে পারছে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাজনৈতিক সংস্কৃতি