এরপর কে?
দুই হাজার ছাব্বিশ সাল। বিশ্ব প্রবেশ করেছে নতুন বছরে। প্রত্যক্ষ করল এক নতুন ঘটনা। ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি, মানুষ মনে রাখবে সেই দিনটি। একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্ট এবং তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে গেল এমন একটি দেশের প্রেসিডেন্ট, যারা সারা দুনিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঠিকাদারি নিয়েছে। এটা শুধু সামরিক অভিযান নয়, এটা একটা স্বাধীন রাষ্ট্রকে অসম্মান, যুক্তিকে পদদলিত, নৈতিকতাকে ছুড়ে ফেলা এবং আইনকে পকেটে রাখা। অভিযোগকারী, গ্রেপ্তারকারী এবং বিচারক একই ব্যক্তি হলে, সবার আগে নিহত হয় বিচারব্যবস্থা এবং ধ্বংস হয় যুক্তি। এ কথা ঠিক যে, যখন যুদ্ধ হয় তখন যুদ্ধ হয় শত্রুর সঙ্গে কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় যুদ্ধে শত্রুর চেয়ে আগে কে মরে? যুদ্ধে সবচেয়ে আগে মরে সত্য। আক্রমণ করব, দখল করব, আমাদের যা প্রয়োজন মনে হবে তাই করব। এই মানসিকতা দিয়ে যে দেশ পরিচালিত হয়, তাকে নিশ্চয়ই গণতান্ত্রিক দেশ বলা যায় না। দেশের জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে দেশ পরিচালনা করলে তাকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না, আধুনিক এবং সভ্য মানুষ বলতেও দ্বিধা করবে। বরং মানুষ বলবে, সেই পুরনো জঙ্গলের আইন ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে সে। আইনের শাসন বা ‘রুল অব ল’ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে বিশ্ব জুড়ে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুদ্ধ, জীবন, রক্ত দিতে দিতেক্লান্ত হয়ে পড়া পৃথিবীতে শান্তি আনার জন্য। যুদ্ধ নয়, আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, সম্মানজনক সম্পর্ক তৈরি করতে পারল না কেন এমন প্রশ্ন তুললে জবাব কী?
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠার পর উৎপাদন এবং বাজার দখলকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের প্রয়োজন দেখা দেয়। যুদ্ধবাজদের থামাতে শান্তিবাদীরা অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু লুণ্ঠন এবং মুনাফার লোভ এত বেশি যে, মানুষ মরলে তাদের কিছুই আসে-যায় না। গণতন্ত্রের সুমধুর বাজনার আড়ালে গণহত্যা চালাতে তাদের দ্বিধা হয় না। জবাবদিহি এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রয়োজনীয় শব্দ। জনগণের জন্য এটা অধিকার আর শাসন ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের এটা দায়িত্ব। সরকার কী করছে, কার জন্য করছে এবং কখন করছে তার জবাব জনগণ চাইবেন। গণতন্ত্রে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ট্রাম্প কি তার ধার ধারেন? মানুষের মর্যাদা, রাষ্ট্রের মর্যাদা এসব কি এখন দুর্বল ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োগযোগ্য শব্দ? আমেরিকাতে নেশার ব্যাপকতা এবং ব্যবসা দুটোই প্রবল এই কথা বলে কানাডা কি সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারবে? আমেরিকায় অস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপক। প্রতি বছর ৩০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায় বৈধ অস্ত্রের গুলিতে। এ কথা বলে মেক্সিকো কি পারবে, আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে অভিযুক্ত করতে? অথবা ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী অশান্তি করছে, এই অজুহাতে রাশিয়া ট্রাম্পকে ধরে এনে বিচার করতে পারবে? পারবে না। তখন শক্তির ভারসাম্য প্রধান বিষয় আর প্রতিটি রাষ্ট্র সার্বভৌম এটাই কি অন্যতম যুক্তি হয়ে দাঁড়াবে না? ট্রাম্প দেখাল, শক্তিশালীরা আইন বানায় কিন্তু মানে না। আইন মানার দায়িত্ব দুর্বলদের। শক্তিশালীদের কাছে আইন এখন নাটক বা যাত্রাপালা। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এখন মৃত্যুপথযাত্রী।
পৃথিবী জুড়ে আলোচনা হচ্ছে, ভেনেজুয়েলার তেলের রিজার্ভ বিশ্বের সর্বোচ্চ। কিন্তু তাদের দেশের মাটির নিচে শুধু তেল নয়, আছে বিপুল পরিমাণ সোনা। এর দাম কি তেলের চেয়ে কম? তথ্য যা বলছে, তাতে সাম্রাজ্যবাদীদের চোখ লোভে চকচক করে উঠেছে। ভেনেজুয়েলার ভূগর্ভে আছে ১৬১ মেট্রিক টন সোনা। যার বর্তমান দাম প্রায় ২২.৫ বিলিয়ন ডলার। এখন লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় স্বর্ণভাণ্ডার ভেনেজুয়েলার হাতে। যে পরিমাণ সোনা তাদের ভল্টে আছে, তার দাম প্রতি আউন্স ১০০ ডলার বাড়লেই, এই মজুদের মূল্য বেড়ে যাবে ৫১৮ মিলিয়ন ডলার। শুধু ভল্টে রাখা সোনা নয়, ভেনেজুয়েলার অরিনোকো মাইনিং আর্কে আছে ১০,০০০ টন অনাবিষ্কৃত সোনা। ভাবা যায়, দশ হাজার টন! বর্তমান বাজার দরে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪,৩৬০ ডলার ধরলে, ভেনেজুয়েলার মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার! ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, আমেরিকার বিশেষ করে ট্রাম্পের নজর আসলে কোথায়? রেজিম চেঞ্জ-এর চটকদারি কথার আড়ালে আমেরিকা আসলে তাদের জ্বালানি সম্পদ, খনিজ সম্পদ এবং মাটির ওপরের সম্পদ দখল করার সুযোগ নিতে চায়। কারণ খনিজ সম্পদ বলতে শুধু তেল নয়। খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে সোনা, কোলটান, রেয়ার আর্থ ও অন্যান্য বহুমূল্য জিনিস। শুধু যদি কোলটান এর কথাই বলা যায়, তাহলে তা তো বিপুল। কোলটানকে বলা হয়, ‘নীল সোনা’, যা প্রতিটি স্মার্টফোন ও ইভি ব্যাটারির প্রাণ। ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে যা আছে, তার মূল্যই ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই মুহূর্তে কিন্তু সোনা তেলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন তেল উত্তোলন করে এক মিলিয়ন টন। তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে আমেরিকার চাহিদা মতো বার্ষিক ৫ কোটি ব্যারেল করতে হলে দরকার ৫৮ বিলিয়ন ডলার। অবকাঠামো পুনর্গঠন না করে, চাইলেই তেলের উৎপাদন বাড়ানো যায় না। পাশাপাশি ৫০ বছর ধরে অব্যবহৃত পাইপলাইন ঠিক করে তেলের পূর্ণ উৎপাদনে আসতে সময় লাগবে বেশ কয়েক বছর। কিন্তু বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সোনা আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে। এই সোনা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য। সোনা বিক্রি করা যাবে, জামানত হিসেবেও রাখা যাবে। আমেরিকার আশা, তাদের অনুগত সরকার ক্ষমতায় থাকলে এই সোনা নিয়ে যাবে তারা নানা অজুহাতে। বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ঋণ, পুনর্গঠন অর্থায়ন এবং ঋণ পুনর্বিন্যাসের জামানত হিসেবে এই সোনা ব্যবহৃত হবে। ফলে সোনা তাদের জন্য এক শক্তিশালী ব্যালান্স শিট। এ ছাড়া আছে কেড়ে নেওয়া ও চুরি করার আরও ফন্দি ফিকির। তথ্য বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে আটকে আছে ভেনেজুয়েলার ১.৮ বিলিয়ন ডলারের সোনা। মাদুরো যদি নিউইয়র্কের কোনো জেলখানায় থাকেন, তাহলে সেই সোনা ছাড়ে আইনি বাধা আর থাকবে না। ইতিমধ্যে বিশ্বে সোনার বাজার চড়া। ২০২৫ সালে সোনার দাম বেড়েছে ৬৫%-এরও বেশি। ১৯৭৯ সালের পর এটাই সোনার ব্যবসায় সেরা বছর। ব্যাংক অব আমেরিকা সোনার বর্তমান দাম বিবেচনা করে ভবিষ্যৎ মূল্য নির্ধারণ করেছে ৫,০০০ ডলার প্রতি আউন্স। ২০২৬ সাল শুধু ভূ-রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের সাল নয়, সোনার বাজার ঊর্র্ধ্বগামী হওয়ারও বছর। সেক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলা হচ্ছে সোনার হাঁস।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পুঁজিবাদী
- রাষ্ট্র পরিচালনা